ওঙ্কার

রয়া ও নন্দিনী – নাদিয়া ইসলাম

Post Views15 Total Count
0Shares
নাদিয়া ইসলাম

বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে দেখে আসলাম রুবাইয়াত হোসেনের কাহিনী, চিত্রনাট্য ও পরিচালনায়, মার্টিনা রডওয়ানের চিত্রগ্রহণে এবং জয়া হক, নীতি মাহবুব ও হাসনাত রিপনের শিল্প নির্দেশনার ৮৮ মিনিটের মুভি—‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ এর প্রেমিয়ার।

মুভি সম্পর্কে কিছু বলার আগে এ্যাপোলজিস্টের (?) মত বলতে চাই, আমি খুব কম মুভি দেখি, খুব কম মুভি দেখেছি জীবনে। এবং সত্যি বলতে, রুবাইয়াতের আন্ডার কনস্ট্রাকশন দেখতে যাবার আগে আমার হাই-এক্সপেক্টেশান(স) ছিল না একদমই। আমি নিজে নারীবাদী, কিন্তু সেকুলার নারীবাদীদের বানানো অনেক মুভিতেই নারীবাদের ভুল ডেফিনিশান, ভুল ইন্টারপ্রিটেশান দেখে প্রধান চরিত্র হিসাবে নারীকে রেখে নারী ডিরেক্টারের বানানো ‘নারীবাদী’ মুভি সম্পর্কে আমার অনাগ্রহ থাকাটা স্বাভাবিক ছিল বলে মনে হয়।

roya-2546-300x153@2xআন্ডার কনস্ট্রাকশন ছবিতে রয়া ও আর্কিটেক্ট স্বামী সামির।
film-Under-Constructionআন্ডার কনস্ট্রাকশন ছবিতে রয়া ও জার্মানী প্রবাসী নাট্য গবেষক ইমতিয়াজ।

আন্ডার কনস্ট্রাকশন তথাকথিত নারীবাদী মুভি না। আন্ডার কনস্ট্রাকশন নারীদের ‘নারী’ হবার এবং নারী হয়ে ওঠার স্ট্রাগলের মুভি। একজন নারীর অন্তর্দ্বন্দ্ব এবং তার সামাজিক-সাংস্কৃতিক-অর্থনৈতিক জীবন, পারিপার্শ্বিক প্রতিকূলতা, তার নিজস্বতার সাথে ধর্মীয় স্বত্তার সঙ্ঘাতের, জীবন-মৃত্যুর-ভাব-অভাবের সংঘর্ষের মুভি—আন্ডার কনস্ট্রাকশন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ক্যাপিটালিজম এবং টোটালিটারিয়ানিজমের বিরুদ্ধে পলিটিকালি কনস্ট্রাকটেড ‘রক্ত করবী’কে বেয়ে বেড়ে উঠেছে ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’-এর গল্প এবং তার তিন আন্ডার কনস্ট্রাকটিং মনের নারী চরিত্র, আজকের পলিটিক্যালি ও লিটারালি- আন্ডার কনস্ট্রাকটেড ঢাকায়।

মুভির প্রধান চরিত্রে ছিলেন শাহানা গোস্বামী অভিনীত তেত্রিশ বছরের ‘রয়া’। রয়া একজন মধ্যবিত্ত থিয়েটার কর্মী। বারো বছর যাবৎ তিনি ‘রক্তকরবী’র সুন্দরী, উর্বরা, যুবতী নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করে আসছেন।

রয়ার স্বামী আর্কিটেক্ট সামির। দ্বিতীয় চরিত্র, মিতা রহমান রয়ার নিম্ন মধ্যবিত্ত ধার্মিক মা, যিনি রয়ার থিয়েটার জীবন নিয়ে যারপরনাই বিরক্ত। সেলাই করে তিনি একার সংসার চালান, একা থাকতে ভালোবাসেন, কিন্তু প্রতি মুহূর্তেই ভাবেন থিয়েটারের এক ‘বেশ্যা’র সাথে চলে যাওয়া তার স্বামী নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার একদিন ফিরে আসবেন তার কাছে।

তৃতীয় চরিত্র, রয়ার গৃহকর্মী, রিকিতা শিমু অভিনীত টিন-এইজার ‘ময়না’। শ্রেণীপার্থক্য পেরিয়ে তিনি রয়ার বন্ধু। ময়না ভালোবাসেন লিফটম্যান সবুজকে। স্বপ্ন দেখেন নিজের সংসারের।

আন্ডার কনস্ট্রাকশন মুভির প্বার্শ চরিত্রে ছিলেন রয়ার থিয়েটারের নির্দেশক, পিউরিটান রাসেল ভাই। তিনি ভাবেন, রবীন্দ্রনাথকে এবং তার গাম্ভীর্যকে ভাঙার বা নতুন করে বানানোর কিছু নেই। তিনি ভাবেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার সৃষ্টিকর্মে কয়েকশ’ বছর এগিয়ে আছেন আমাদের সবার থেকে এবং তার শেষ কাজ ‘রক্তকরবী’তে নন্দিনী দাঁড়িয়ে আছে সৌন্দর্য, প্রেম, আকাঙ্ক্ষা এবং স্বাধীনতার প্রতীক হিসাবে। সে জীবনহীন যক্ষপুরীর বিভৎস অন্ধকার অর্থাৎ জড় যান্ত্রিকতার সামনে একঝলক আলোর মত, তাকে বিনির্মাণ করা যায় না, তাকে নতুন ভাবে উপস্থাপনের সুযোগ নেই কোথাও।

দ্বিতীয় প্বার্শ চরিত্র নাট্য গবেষক জার্মানি প্রবাসী ইমতিয়াজ, যিনি রবীন্দ্রনাথের ‘অলীক’ নন্দিনী থেকে ‘সত্যিকারের’ নন্দিনী হয়ে ওঠার প্রেরণা দেন রয়াকে।

রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ লিখেছিলেন ১৯২৬ সালে শিলং বেড়াতে গিয়ে। তিনি দেখেছিলেন জঞ্জাল আর আবর্জনা আর কাঁটা তারের মাঝখানে কীভাবে যেন ফুটে উঠেছে একটি রক্তকরবী ফুল, আর তা দেখেই তিনি তৈরি করেছিলেন ‘নন্দিনী’ চরিত্র, লিখেছিলেন যক্ষপুরীর পীড়িত মানবতার এবং অবমানিত যন্ত্রকাঠামোর অত্যাচার ও অবিচারের গল্প।

নাটকটির রাজা ছিলেন প্রজাশোষক এবং তার কাছে তার কুলিরা একটা নাম্বার ছাড়া আর কিছুই ছিল না। নন্দিনী সেখানে প্রেম নিয়ে আসে, মুক্তির বার্তা নিয়ে আসে, নতুন জীবনের স্বাদ নিয়ে আসে; কিন্তু তাকে বা তার প্রেমকে পায় না কেউই। না রাজা, না সন্ন্যাসী, না তার প্রেমিক রঞ্জন। রুবাইয়াতের আন্ডার কনস্ট্রাকশনের রয়ার দুই জীবনও নন্দিনীর গল্পের সাথে এক হয়ে হয়ে যায় বার বার। রয়া ভাঙতে চায় নন্দিনীকে, রয়া ভাঙতে চায় তার একান্ত মধ্যবিত্ত সংস্কারকে। রয়া বুঝতে চায় নন্দিনী কেমন, নন্দিনী কেন, নন্দিনী কে। সে কি প্রেম, সে কি ময়নার পেটের সন্তান, সে কি সে নিজেই? সে জানতে চায়, রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা ‘ঢাকা’ কি ‘রক্তকরবী’রই বিশাল সেট?

Advertisement

আন্ডার কনস্ট্রাকশন মনস্তত্ত্বের গল্প। কনট্রাডিকশানের গল্প। এ গল্পের একদিকে আছে প্রথাগত, সুন্দরী, সদাহাস্যময়ী ১২ বছরের নন্দিনী এবং সংসারী স্নেহপরায়ণ সাধারণ রয়া। সে স্বামীর জন্য খেটেখুটে রান্না করে সারাদিন ধরে, স্বামীর ট্রাভেল ব্যাগ গুছিয়ে দেয়, স্বামীর থেকে ব্যাঙ্কের চেক লিখে নেয়, ময়নাকে অংক করায়, ময়নার সাথে সবুজের প্রেম আটকাতে চায়, ময়নাকে আটকে রাখতে চায় ভালোবাসায়, নাস্তিক বিরোধী মিছিলের সামনে গায়ে ওড়না তুলে নেয়। আর অন্যদিকে আছে বিদ্রোহী উস্কোখুস্কো চুলের মেক-আপ বিহীন নন্দিনী তথা রয়া। সে বাচ্চা চায় না, সে স্বার্থপর, সে নতুন নন্দিনীকে নিয়ে অসুস্থ মা’কে ফেলে ইমতিয়াজের সাথে ঘুরে বেড়াতে চায় ইয়োরোপের দেশে দেশে। সে প্রথা ভাঙতে চায়, সে নিজেকে ভালোবাসতে চায়, বাঁচতে চায় নিজের জন্য।

রয়ার মনের ডিলেমা তৈরি করতে সাহায্য করে রয়ার মা, ময়না এবং রয়ার বান্ধবী সাবাহ, যে কিছুদিন আগে নিজের পি-এইচ-ডি পোস্টপোনড করে বাচ্চা নিয়েছে। আধুনিক ঢাকার মেয়েদেরকে সবাই (অর্থাৎ পুরুষেরা) যেমন দেখতে ভালোবাসে, সাবাহ তার প্রতিচ্ছবি। সে সব পারে। সে পি-এইচ-ডি করতে পারে, তিন মাসে দশ পাউন্ড ওজন কমাতে পারে, ল্যাকটেট করলে ব্রেস্ট পাম্প করে বাচ্চাকে দুধ খাওয়াতে পারে, সংসার চালিয়ে চাকরি ঠিক রাখতে পারে, পার্লারে গিয়ে ম্যাসাজও নিতে পারে। রয়া তাকে দেখে, তার মেয়ে বাচ্চাটাকে স্বপ্নে দেখে, দেখে বাচ্চাটার মাথার কাছেই পড়ে আছে নন্দিনীর জমিয়ে রাখা নীলকণ্ঠ পাখির পালক।

এদিকে ময়না-সবুজের প্রেম, ময়নার কনসিভ করা এবং সেই সূত্রে তার রয়ার বাসা থেকে বের হয়ে যেয়ে গারমেন্টস ফ্যাক্টরিতে কাজ নেওয়া, সবই রয়ার মনঃজগতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। সে ময়না আর তার গারমেন্টস-জীবনকে নন্দিনী আর যক্ষপুরীর প্রতিচ্ছবি হিসাবে দেখে, ময়নার অনাগত সন্তানের ভেতর দেখে রঞ্জনের ছায়া।

MV5BOGRkNDIxMGUtYTllZS00ZjNhLWI1MGMtNjZjMGVhZmU5NGQzXkEyXkFqcGdeQXVyNDI3NjcxMDA@._V1_UX182_CR0,0,182,268_AL_আন্ডার কনস্টা্রকশন মুভির পোস্টার

আন্ডার কনস্ট্রাকশন-এর গল্প সম্ভবতঃ ঢাকার প্রতিটা মধ্যবয়সী মেয়ের গল্প। রুবাইয়াত এই গল্পে সমাপ্তি টানেন নি, তিনি রেখে দিয়েছেন সম্ভাবনা, হয়তো দর্শকের জন্য, হয়তো নিজের জন্যই।

এই গল্পে তিনি ময়না, রয়া এবং রয়ার মা এই তিন চরিত্রের ভেতর মনঃদৈহিক, আর্থ-সামাজিক, শ্রেণি-কন্ট্রাডিকশান রেখেও হয়তো দেখাতে চেয়েছেন, এদের মধ্যে একটা জায়গায় খুব মিল—নিজের জন্য বাঁচতে চাওয়া এই সব মেয়েদের পথ চলার একাকীত্ব খুব সর্বজনীন।

ময়না বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার পর রয়া একদিন বিয়ের উপহার নিয়ে ময়নার বস্তিতে দেখা করতে যায়। উপহার পেয়ে ময়না খুশি হয়, কিন্তু বলে, গয়নাগুলি যেন রয়া তার কাছেই গচ্ছিত রাখে। তার স্বামী এর খবর জানতে পারলে তার কাছ থেকে জোর করে নিয়ে যাবে। রয়ার মতো ময়নাও নিজের সমাজের যক্ষপুরীতে বাঁধা পড়ে থাকে। রয়ার মত সংগ্রাম করার তার মানসিক জোর নেই, তার অর্থ উপার্জন একান্তই নিজের অনাগত সন্তানের কথা ভেবে, কিন্তু তারপরেও সে জানে, চিরদিন আরেকজনের শ্রেণীদাস হয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব না।

আন্ডার কনস্ট্রাকশন  সম্পর্কে বলতে গেলে শুধু কাহিনী না, তার রবীন্দ্রনাথকে ভেঙে গড়া অত্যাধুনিক ‘রক্তকরবী’র প্লটে রানা প্লাজায় ভেঙে পড়া ঢাকা শহরকে দেখানোর সিনেমাটোগ্রাফি সম্পর্কে, কাহিনী এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ভঙ্গি সম্পর্কে, চরিত্রদের আমার আপনার সাথে মিশিয়ে ফেলার অভিনব অভিনয়শৈলী সম্পর্কে, মেইক আপ এবং কালার গ্রেডিং, লাইটিং, এডিটিং ও প্রোডাকশান ডিসাইন সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই না।

মুভির শট চয়েসের ক্ষেত্রে মুভি মেকিং-এর গ্রামার ধরে এগুনো কিছু সিনেম্যাটিক শট দেখা যায়, কিন্তু তারপরেও তার সিনেমাটোগ্রাফিকে গল্পের চাইতে আলাদা বা বড় করে দেখানো হয় নি, বরং গল্পটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রাসেল ভাইয়ের অভিনয়কে ‘অতি অভিনয়’ বলে মনে হলেও থিয়েটারকর্মী হিসাবে তার উচ্চারণ এবং বাচনভঙ্গী তার চরিত্রের সাথে মিশে গেছে বলে আমি মনে করি। বাকিদের ক্ষেত্রে সাবলীল অভিনয় ছাড়াও ক্ষেত্রবিশেষে বাচনভঙ্গী পালটে ফেলার মধ্য দিয়ে শ্রেণিপার্থক্য ফুটিয়ে তোলার এবং প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করার প্রয়াস মুগ্ধ করার মত।

নির্মাণাধীন ঢাকার খণ্ডচিত্র সহ প্রতিটি ডিটেইলিং-এর জন্য প্রোডাকশান ডিসাইনারের ধন্যবাদ প্রাপ্য। রয়ার মা মেয়ের স্বামী সামির বাসায় আসবেন তাই ঘরে পরার শাড়ি পালটে নতুন শাড়ি, ব্লাউজ পরলেন। ব্লাউজের নিচে ব্রার ফিতা সযত্নে লুকিয়ে ঘাড়ের ওপর দিয়ে শাড়ির আঁচল টেনে নিয়ে আসলেন। মেইক আপ এবং কস্টিউমের ক্ষেত্রেও আন্ডার কনস্ট্রাকশন টিম বেশিরভাগ বাংলা ছবির জবড়জং সাজপোশাক থেকে বের হয়ে আসতে পেরেছে। চরিত্রের এবং দৃশ্যের প্রয়োজনে মেইক আপ এসেছে, এবং তা চলেও গেছে পরবর্তী দৃশ্যে।

রয়াকে দেখা যায় নিজের ঘরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নাটকের প্র্যাকটিস করতে। তার পরনে শাড়ি, এক প্যাঁচ দিয়ে পরা। চুল উস্কোখুস্কো, মুখ ঘামে ভেজা। ঠিক এই সময়েই সামির এসে জানায়, সে (ব্যাংকক ?) যাচ্ছে। রয়া দৌড়ে গিয়ে তাকে সদর দরজায় বিদায় জানায়। সামির কিছুটা ভাবলেশহীন স্বরে রয়াকে বলে, তার এখন নাটক ছেড়ে দেবার কথা। তার এখন বাচ্চা নেবার কথা। সামির বের হয়ে গেলে ক্লান্ত রয়া সাপের খোলস পাল্টানোর মত করে করিডোর দিয়ে যেতে যেতে শাড়ি খুলে ফেলে। শাড়ির নিচে থাকে টি-শার্ট এবং সোয়েট প্যান্টস।

under-construction-2016-bangla-movie-trailerআন্ডার কনস্ট্রাকশন মুভিতে রয়া ও তার মা
under_construction20160126134152আন্ডার কনস্টা্রকশন মুভিতে রয়া
Under Constructionআন্ডার কনস্টা্রকশন মুভিতে রয়া ও নন্দিনীর রিহাসে‍র্ল

আন্ডার কনস্ট্রাকশন এর আরেকটি মজার ব্যাপার ছিল, তার ইন্টারপ্রিটেশানের সুবিধা বা অধিকার দর্শকের হাতে ছেড়ে দেবার ভঙ্গি। ময়নার গল্পের সাপ-স্বামীকে রয়া তার পাশে শুয়ে থাকতে স্বপ্ন দেখে। সেই সাপ কি শুধুই ময়নার গল্প থেকে রয়ার অবচেতনে এসেছে নাকি সে সামিরকে সাপ হিসাবে ভাবতে শুরু করেছে; নাকি এই সাপ দিয়ে আমাদের আশেপাশের কিছুসংখ্যক পুরুষকে বোঝানো হয়েছে তার অনুবাদ একান্তই দর্শকের হাতে। তেমনিভাবে, ইমতিয়াজ ও রয়ার প্রেমের দৃশ্যের পরেই রয়াকে দেখা যায় নিজের পোষা গোল্ডফিশ ‘গোলমরিচ’ ও সবুজ রঙের কাছিম ‘নন্দিনী’র সাথে বাথটাবে পানির ভেতর বসে থাকতে। এই দৃশ্য কি পোস্ট-কয়টাল নাকি শুধুই তার একাকীত্বের প্রতিচ্ছায়া তাও দর্শকের অনুবাদের উপর ছেড়ে দিয়েছেন পরিচালক। তেমনিভাবে ইমতিয়াজকে বাসায় খাবার দাওয়াত দেওয়ার আগে রয়ার সাজার দৃশ্য প্রশ্ন তৈরি করতে পারে, রয়া কি তার দৃশ্যতঃ সুখের বিবাহিত জীবনে আদতে অসুখী নাকি ইমতিয়াজের প্রতি তার আকর্ষণ শুধুমাত্র প্রথা ভাঙ্গার নিমিত্তেই? নাকি সে খ্যাতির লোভে ইমতিয়াজকে সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে?

Advertisement

বাহুল্যবিহীন এডিটিং মুভিটিকে একটি অন্য মাত্রা দিয়েছে। সামির এবং রয়ার বিছানার দৃশ্যে বা ইমতিয়াজের সাথে অন্তরঙ্গ মুহূর্তের দৃশ্যে তেমনভাবে সিনেমাটিক স্টাইলে আলো বা শব্দ যোগ করা হয় নি বলেই মুভিটি প্রতীকি হওয়া সত্ত্বেও তাকে কাল্পনিক বা সুররিয়েল মনে হয় নি। মুভিটিতে গানের সংখ্যা এমনকি বাংলাদেশের এক্সপেরিমেন্টাল মুভির তুলনায়ও কম। কিন্তু কখনোই গানের অভাব বোধ হয় নি, বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনে হয়েছে এই নিস্তব্ধতা না থাকলে দৃশ্যটি হয়তো পরিপূর্ণ হতো না। ময়নাকে রেখে রয়া যেই মুহূর্তে নৌকায় উঠে তার নিজের জীবনে ফিরে যাচ্ছিল, তখন শব্দ বলতে বৈঠার গায়ে পানির মৃদু শব্দ আর একটা নিঃসঙ্গ ঘুঘুর ডাক শোনা যাচ্ছিলো দূর থেকে। প্রতিটি দৃশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাউন্ড ডিসাইন এবং মিউসিকের জন্য মিউসিক ডিরেক্টার শায়ান চৌধুরী অর্ণব, সাউন্ড ডিসাইনার সুজন মাহমুদ এবং নেপথ্য শিল্পী সাহানা বাজপেয়ী হেরেটকে ধন্যবাদ দিতে হয়।

বাহুল্যবিহীন, গাম্ভীর্যবিহীন, সমাপ্তিবিহীন ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ আমাদের ঢাকা শহরের মেয়েদের নিজেকে খুঁজে পাওয়ার, অন্তরের সত্য অনুসন্ধানের গল্প। রুবাইয়াত তার কোনো বই পড়া মুখস্ত বিদ্যা জাহির করার চেষ্টা করেন নি, চেষ্টা করেন নি তার চিন্তাচেতনা, তার সমাজ-দর্শন রয়ার ওপর, নন্দিনীর ওপর, ময়নার ওপর, রয়ার মা’র ওপর বা দর্শকের উপর চাপিয়ে দিতে।

একটা গল্পের ‘চলচ্চিত্র’ হয়ে ওঠার শৈল্পিক যাত্রা আন্ডার কনস্ট্রাকশন। রয়ার মত আমাদের স্বামী, সংসার, মা, সমাজ, সন্তান, পুরুষতান্ত্রিকতাকে একপাশে রেখে নিজের জন্য বাঁচার স্বপ্ন দেখার গল্প ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’। আগামী ২২ জানুয়ারি ২০১৬ তে ঢাকার বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে মুভিটি। বাংলা মুভি নিয়ে নাক সিঁটকানো সবাইকে হলে গিয়ে মুভিটা দেখার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।

বেঁচে থাকুক নন্দিনী, বেঁচে থাকুক বাংলা ছবি।

300547_10150269756420685_5136745_n
নাদিয়া ইসলাম

বিভাগ

কবিতা

error: Content is protected !!
We use cookies to personalise content and ads, to provide social media features and to analyse our traffic. We also share information about your use of our site with our social media, advertising and analytics partners. View more
Cookies settings
Accept
Privacy & Cookie policy
Privacy & Cookies policy
Cookie name Active

🍪 We Use Cookies

Our website uses cookies to improve your experience. They help us remember your preferences and analyze traffic. Some cookies are essential, while others help us optimize content. By continuing to browse, you agree to our use of cookies. You can manage cookie settings in your browser.

Save settings
Cookies settings
Scroll to Top