ওঙ্কার

ফাঁকি – আল-বিরুনী প্রমিথ

Post Views18 Total Count
0Shares
আল-বিরুনী প্রমিথ

ডেস্ক থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে গলা ভেজালে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। নাসরীনের মনে হয় যেন বহুদিন ধরে তার এরকম তীব্র তৃষ্ণা জাগেনি। গলার নিচ দিয়ে পানি নামতে থাকলে হালকা নীল রঙের শিরার আঁচ পাওয়া যায়। কিন্তু আশেপাশের কেউই তা দেখে না। তার পাশের ডেস্কের জিল্লুর সাহেব দুপুরের লাঞ্চের পরে স্বভাবসুলভ নিজের ভুঁড়িতে হাত বোলাচ্ছেন। কতোদিন হলো এই দৃশ্যটা নৈমিত্তিক, নাসরীনের তবু অসহ্যবোধ হয়। আজও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেন নি। তার মনে হয় আরেক গ্লাস পানি খাওয়া দরকার। বেল টিপলে একটা শব্দ করেই তা নিয়ম করে নিস্তব্ধ হয়। সাড়ে বাইশ বছরের ওসমান কোঁচকানো কালো রঙের শার্ট পরে সামনে এসে নির্বাক দাঁড়ায়। শেভ করতে গিয়ে গালের দুইপাশের জুলফি দুই রকম হয়ে গেছে। নাসরীনের প্রথমে সেই দিকে চোখ পড়ে। ভাবলেন কিছু একটা বলবেন। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিলেন। অফিসে এই ধরণের দেয়ালা করাকে প্রশ্রয় না দেওয়াই ভালো। স্বাভাবিকের চাইতেও শান্ত স্বরে ওসমানকে এক গ্লাস পানি আনতে বললে কোন কারণ ছাড়াই পানি আনতে ছুটে চলে যায়। এই দুপুরে বেশ গরম গরম লাগছে নাসরীনের। হেমন্ত চলে এসেছে। কয়েকদিন ধরে রাতেরবেলায় বেশ শীত পড়ে। আজকে সকালেও বাসা থেকে বেরুবার সময় শীতকে অনুভব করেছিলেন। বাসে উঠবার পরেও নাসরীনের শরীরে ঠাণ্ডা একটা স্পর্শ রয়ে গিয়েছিলো।

ওসমান পানির গ্লাস এনে নিরাসক্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। তার শার্টের কোনায় ঘামের দাগ একটু একটু করে লেগে গেছে তা নাসরীনের নজর এড়ায় না। অনন্তকাল মনে হবে এমন সময় ধরে দ্বিতীয় গ্লাসের পানি নাসরীন ঢকঢক করে খেতে থাকেন। অফিসের বড় দেয়াল ঘড়িটার পাশে একটা বৃদ্ধ টিকটিকি অনেক সময় ধরে স্থানু বসে ছিলো। সেও দুইবারের মতো ঘড়ির চারপাশে চক্কর দিয়ে ফেলে। প্রায় তিন বছরের পুরনো অফিস ফ্যানের ব্লেডগুলোর কিনারায় ধুলো জমে জমে পাখাগুলো বেশ কালো হয়ে উঠেছে। নাসরীন গ্র্যাচুইটির ফাইলটার এপ্লিকেন্টের প্রোফাইলের দিকে তাকান। কোন কারণে, যা অন্যদের কাছে অজানাই থেকে যাবে, নাসরীনের বুকে বাষ্প জমে। ডান হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে শাড়ীটা একটু টেনে নেন। ফাইলটার দিকে মনোযোগে ছেদ পড়ে। ক্যাশ সেকশনের আজীজ সাহেব ততোমধ্যে তার রুটিন প্রেমালাপ শুরু করে দিয়েছেন।

‘কি করো গো? অ্যা, শুনি নাই কি কও। ও, এখন বুঝলাম। এই অফিসের ফোনটা না, একেবারে যা তা। বালের একটা ফোন। এই শোনো না, তোমারে পরে বলতে হয়তো ভুলে যাবো। আজকে সকালে বীনার হাসবেন্ড মেরাজ ফোন দিছিলো। পরশুদিন ওদের এনিভার্সারী। খুব করে আমাদের যাইতে বলছে। আগেই বলে রাখলাম। লাল কালো রঙের শাড়ীটা কিনে পরতে পারো নাই। এইবারে চান্স পাইছো। সেটা পরবা। সবাই দেখুক তুমি কত্তো সুন্দরী। আরে আমি মিথ্যা কথা কই তোমার কাছে? এতোদিন আমারে এই চিনলা ? হে হে হে’

নাসরীনের মুখের মাংসপেশী শক্ত হলেও বলার কিছু ছিলো না। সেটাই প্রত্যাশিত ছিলো। কিন্তু হলো না। যদিও ভ্রু ঠিকই কুঁচকে গেলো। চারপাশে একটুকু যদি স্বস্তি মেলে। বউয়ের প্রতি প্রেমে গদগদ আজীজ সাহেবকে দেখলে বাইরের কে বুঝবে এই লোকই মাসে পনেরোদিন অন্তর অন্তর শান্তিনগরে রক্ষিতার কাছে মৌজ মেরে আসে? অফিসের প্রত্যেকেই জানে। এমনকি যেদিন সকালে অফিসে সেন্টের কড়া গন্ধে অফিস ভরে যায় সেদিন বেয়ারাগুলো পর্যন্ত বোঝে আজকে তাদের আজীজ স্যার অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় যাবে না। ফাঁকি, চারিদিকে এক দমবন্ধ করে দেওয়া ফাঁকির বিশাল আস্তর। খালি অফিস? হাহ, ব্যক্তিজীবনেও তো …নাসরীন দীর্ঘশ্বাস চেপে রাখতে চাইলেও সেটা পারেন না। তবে সেটার প্রকাশ অত্যন্ত সংগোপনেই ঘটে। চারপাশের কেউ টের পায় না। গ্র্যাচুইটির ফাইলটার দিকে এবারে পূর্ণ মনোযোগ দেন। আজকের জন্য এটাই তার শেষ ফাইল। এই ফাইলের এপ্লিকেন্ট নাসরীনের পরিচিত। তার কলেজের বান্ধবী সীমার বড় ভাইয়ের। ভদ্রলোকের সম্পর্কে নাসরীনের বেশ ভালো জানাশোনা আছে। তার অনেক কিছু চকিতে মনে পড়ে গেলে আরো একবার বুকে একটু ভার বোধ করেন। ভান। অতি ব্যবহৃত এই সাধারণ শব্দটিই তার মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকে। যেন শব্দটা মগজে একটা জট রেখে যায়।

বিকাল প্রায় পড়ে আসে। রিকশায় উঠতে উঠতে নাসরীন কিছু একটা ভাবেন। তার কপালে বিনবিনে ঘাম দেখা দেয়। অথচ রোদের আলো যা আছে সেটা এমন কড়া কিছু নয়। বহু সময় ধরে ভাবতে থাকা একটি বিষয়ে নাসরীন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসেন। তার পিতৃহীন, ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েটার সাথে আজকেই খোলাসা করে কথা বলবেন। পরশুদিন রাতে পানি খেতে উঠবার পরে একটুকু বারান্দায় বসতে গিয়ে নাসরীন চমকে গিয়েছিলেন। রাতের মিটমিটে আলোতে কি একটুকরা কাগজ দেখছিলো মেয়েটা। তাকে দেখেই ভূত দেখবার মতো চমকে উঠেছিলো। ট্রাফিকের ধারাবাহিক হর্ন নাসরীনের আত্মমগ্নতায় ব্যাঘাত ঘটায়। তিনি সচকিত হন। এখন আর রাস্তাঘাটে এরকম ক্যালাস হবার বিলাসিতা করা যায় না। ব্যাগটায় বেশ আগে করে রাখা অব্যবহৃত পাসপোর্টসহ বেশ কিছু জরুরি কাগজ আছে। তাকে কাছে টেনে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে আসেন। শহরে ভীড় একটু একটু করে বাড়তে আরম্ভ করে। অনেকেই বাড়ি ফিরছে। এমন সময়ে শহরের সর্বত্র জ্যাম লেগে থাকে।

এই সময়ে বাড়িতে কেউই থাকে না। মেয়েটা টিউশনি করতে তার ছাত্রীর বাসায় চলে যায়। নাসরীন এসে প্রথমেই ওয়াশরুমে ঢোকেন। তার বহুদিনের অভ্যাস। বাড়ি ফিরেই গোসল করে ফ্রেশ না হলে তার অস্বস্তি হয়। তবে আজকে সেখানে বেশী সময় ব্যয় করেন না। দুপুরে বেয়ারা কোত্থেকে যেন অফিসের সবার জন্য খিচুড়ি এনেছিলো। দুই থেকে তিন গ্রাসের বেশী মুখে তুলতে পারেননি। ঝটপট ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই নাসরীন গতকাল রাতে রান্না করা ভাত গরম করে তার সাথে একটুকু হালকা সবজি নিয়ে খেতে বসেন। ফ্যানের বাতাসটা যেন অন্য দিনের চাইতেও আজকে বেশী বাতাস দিচ্ছে। অনেকদিন পর আজকে একটা ফয়সালায় আসা গেছে ভেবে তার মুখের রেখাসমূহ সহজ দেখায়। প্রতিটি গ্রাস তার বড্ড আরামদায়ক ঠেকে।

খাওয়া শেষে সারাঘরে একটু ঘুরপাক খেতেই বড় ঘড়িটা পাঁচটা বেজে গেছে সশব্দে সেই সংকেত দেয়। ঘড়িটার পাশে অনেকদিনের স্থূলকায় ধুল জমেছে। নাসরীন কি মনে করে মেয়ের ঘরে যান। বরাবরের মতোই ঘরটার আগপাশতলা গোছানো। ওয়ার্ডড্রবের উপরে ছোট্ট একটুকরা কাগজকে অবহেলিত পড়ে থাকতে দেখা যায়। এরকমটা সচরাচর দেখা যায় না। নাসরীন সাধারণ কৌতুহলেই তার দিকে এগিয়ে আসেন। কাগজে লেখা কথাগুলো টানা তিনবার উচ্চারণ করে করে পড়েন। জানালার শার্সিতে মৃদু শব্দ শোনা যায়। নাসরীন একহাতে কাগজটা রেখেই থম মেরে দাঁড়িয়ে থাকেন। সময়টা দাঁড়িয়ে থাকবার সাপেক্ষে বেশ দীর্ঘ। অফিসে কলিগের ব্যক্তিজীবনের মিথ্যাচার, বান্ধবীর ভাইকে প্রাপ্য গ্র্যাচুইটি থেকে বঞ্চিত করতে বাধ্য হওয়া, প্রেমিকের সাথে আত্মজার পালিয়ে যাবার চিঠি এই সবকিছুর সংমিশ্রণে যেই একটি শব্দ তার মাথায় মুহুর্মুহ আঘাত করতে থাকে তা বহুল ব্যবহৃত একটি শব্দ, ফাঁকি। তীব্র রোষে নাসরীন ঘর থেকে বেরুতে যান। খাটের পায়ার সাথে তীব্র আঘাত লাগলে তার ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল যেন আপাদমস্তক ছিঁড়ে বেরিয়ে যেতে চায়। যন্ত্রণাটা কিছুক্ষণের জন্য একটু দাঁত চেপে সহ্য করে নিলে তিনি দেখেন নখের একাংশ ভেঙ্গে লাল রঙ বের হয়েছে। রক্তের রঙটাও কেমন যেন ফিকে ফিকে দেখাচ্ছে। সবকিছুর মতো রক্তও কি তাইলে …

শেষ পর্যন্ত শরীরের রক্তও যদি ফাঁকি দিতে শুরু করে তবে শেষ আশ্রয়ের জায়গা আর অবশিষ্ট থাকে কই? শার্সিতে আবারো শব্দ শোনা যায়।

pramith galpo

pramith
আল-বিরুনী প্রমিথ

গল্পকার

বিভাগ

কবিতা

error: Content is protected !!
We use cookies to personalise content and ads, to provide social media features and to analyse our traffic. We also share information about your use of our site with our social media, advertising and analytics partners. View more
Cookies settings
Accept
Privacy & Cookie policy
Privacy & Cookies policy
Cookie name Active

🍪 We Use Cookies

Our website uses cookies to improve your experience. They help us remember your preferences and analyze traffic. Some cookies are essential, while others help us optimize content. By continuing to browse, you agree to our use of cookies. You can manage cookie settings in your browser.

Save settings
Cookies settings
Scroll to Top