ওঙ্কার

বমি বিকার অথবা অকাল স্খলন – অমল আকাশ

Post Views20 Total Count
0Shares
অমল আকাশ

না, দেখবে না সে। কিছুতেই তাকাবে না জ্যামে আটকেপড়া বাসটার জানালায়। এসব দেখতে আসেনি সে। দেখতে এসেছে মানুষের ঢল। আর একবারও ফিরে তাকাবেনা মহিলাটার দিকে। নিজেকে বোঝায় এটা একটা অসুখ। এ অসুখের হাত থেকে ও মুক্তি চায়। সেরে উঠতে চায় দ্রুত। কিভাবে? কাকে বলবে সে এসব বিকারগ্রস্থতার কথা! পারবে না, কাউকে বলতে পারবে না। নিজেকেই নিজের সামলাতে হবে। পারতে হবে। না, না কিছুতেই তাকাবে না বাসের জানালাটার দিকে, যেখানে গ্রাম থেকে সুড়ৎ করে ঢাকা শহরে ঢুকে পড়া একটা মহিলা মাথা বের করে বিশ্রিভাবে বমি উগরে দিচ্ছে। বিকট শব্দে বমির গমকে গমকে শাহবাগের কালো রাস্তায় ছিটকে পড়ছে গলে গলে যাওয়া ভাত, আলু, মটরদানা, শুকনো মরিচের খোসার অংশ, সাথে প্রচুর হলুদ হলুদ লোত। মহিলাটা পেট উগড়ানো বমির প্রেসারে হাঁপিয়ে উঠেছে। সেই পরিশ্রমে চোখের কোণ বেয়ে নোনতা জলও গড়িয়ে পড়ছিলো। আর বেয়ে আসা শ্লেষ্মার স্রোতটাকে বাঁ হাতে নাক টিপে ঝেড়ে নিয়ে আবার দ্বিতীয় কিস্তি বমি করার উদ্যোগ নিচ্ছিলো মহিলা। এবার গলা দিয়ে তরল বেরিয়ে আসার আগেই প্রচুর ওয়াক ওয়াক শব্দ হচ্ছে। আর সেই শব্দ ফুটপাতের উপর ছেলেটাকে বেঁধে রাখতে পারছে না কিছুতেই। ক্রমশ নিজের সাথে এই লড়াইয়ে পরাস্ত হতে চলেছে সে। বমির শব্দ ওকে টানছে, ভীষণ টানছে। বমন ক্রিয়ার ধ্বনি মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে খেতে একটা ঘন আর গলিজ শিৎকার নিঃশ্বাসে রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে।

মেয়েটা আঙ্গুলের রঙিন নখ দিয়ে ছেলেটার উদাম শরীর খামচে ধরে বারবার বলছিলো, ‘আর একটু থাকো প্লিজ! আমার এখনো হয়নি। চেষ্টা করো, তুমি পারবে।’

আজও পারলো না সে। নিজের অজান্তে তার পা চলে যাচ্ছে বাসের জানালার দিকে। এখন কি করবে সে! কিভাবে ফিরাবে নিজেকে? আজকাল অসুখটা বেড়ে যাচ্ছে। শুধু বমি নয়, কাউকে দলা পাকানো থকথকে কফ ফেলতে দেখলেও ওর ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। ছুটে যায়। কফের দলা কারো মুখ থেকে মাটিতে পরার আগেই সে তার মুখ পেতে দেয়। কিন্তু মুখে অন্যের কফ নিয়ে আর গিলতে পারে না। কুৎসিত অনুভূতিতে পরক্ষণেই বমি হয়ে যায়। বমির প্রকোপে পেটের নাড়িভুড়ি সব বেরিয়ে আসতে চায়। সারাটাদিন ঘেন্নায় নিজের শরীরটার দিকে নিজেই তাকাতে পারেনা। স্পর্শ করতে ইচ্ছে করে না, সারাদিন, হায়! এমন অসুখ নিয়ে কোথায় যাবে সে, কোথায়?

ছুটির দিনগুলোতে সে যমুনা ফিউচার অথবা শহরের যেকোন দামী শপিং মল, যেসব জায়গায় পয়সাওয়ালা ছেলেমেয়েরা আসে, সেখানে সেও ঘুরে বেড়ায়। তবে হ্যাঁ, দামী রেস্টুরেন্ট অথবা ক্লাবগুলোতে যাওয়ার সামর্থ নেই বলে, শপিংমলগুলোতেই সে তার প্যান্টের পকেটে ব্যবহৃত আঠালো কনডম নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওর নিজেরই ব্যবহার করা কনডম, এমন কোথাও ফেলবে, যেখানে ফেলতে পারলে ও তৃপ্তি পাবে। এ কিসের তৃপ্তি ওর! জানে না। জানে না কেন শপিং-এ আসা অপেক্ষাকৃত উঁচু স্তনবতী মেয়েদের বুকের দিকে অমন নিঃষ্কাম তাকিয়ে থাকে, ঘন্টার পর ঘন্টা।

একদিন কামড়ে দিয়েছিলো। ঘুমের ঘোরে নানীর শুকনো বোটায় কামড়ে দিয়েছিলো। নানি ওর মাথায় একটা চাটি মেরে বলেছিলো, ‘অই হারামজাদা করস কি! তর মার দুধ খাইয়া আত্মা মিটে নাই দেইখ্যা আমরাটা কামরাইতাছস!’ ছেলেটা মায়ের কথা ভাবে, ভাবতে ভাবতে একটা হাড় জিরজিরে শুকনো কঙ্কালমতো শরীর সামনে এসে দাঁড়ায়। যার স্তনের দুধ ওর জন্মের আগেই দারিদ্র আর অসুস্থতা এসে শুকিয়ে খেয়েছিলো। ছোটবেলায় মায়ের বুক হাতড়ে শুকনো চামড়া আর ক্ষয়রোগের গাঢ় কম্পন ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পেতো না সে। মায়ের শরীরটা যখন মরে যাচ্ছিলো, শুকনো শরীরটা যন্ত্রণায় ধনুকের মতো বাঁকাতে বাঁকাতে যখন মরে যাচ্ছিলো, তখন মায়ের রক্ত বমিতে ভেসে গিয়েছিলো ছেলেটার সমস্ত শরীর। সরকারি হাসপাতালের বারান্দায় কেউ ছিলো না তখন। খুব মা নেওটা ছিলো বলে এক মুহুর্তের জন্যও কোথাও নড়তে পারে নি ও। ভোর রাতে রক্ত বমিতে ওকে ভাসাতে ভাসাতে মরে গিয়েছিলো মা।

ছেলেটার মুখ থেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে, মেয়েটা বললো, ‘তুমি এমন অদ্ভূত বিহ্যাব করো, মনে হয় আমি বাচ্চাকে ব্রেস্টফিড করাচ্ছি। অমন করো না সোনা, আমার অনুভূতি ছুটে যায়।’

ছেলেটা প্রথমে ভায়াগ্রা খাওয়ার অথবা জিমে যাওয়ার কথা ভেবেছিলো। ডাক্তার বললো নিয়মিত ভায়াগ্রা কোন স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। তাই ভাবলো জিমে যাই। কিন্তু জিমে যাওয়া ছেলেগুলোর শরীর দেখলে ওর মাংসের দোকানের কথা মনে হয়ে যায়। শরীর জুড়ে থরে থরে সাজানো মাংস! ওর ঘেন্না লাগে। তখন একটা ইচ্ছা ওর তীব্র হয়। ওর ইচ্ছে করে, শপিংমলে এই মাংসের দোকানঅলা শরীরের ছেলেগুলো যখন গায়ে যৌন উত্তেজক পারফিউম মেখে গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, তখন ওদের মুখের উপর প্যান্ট খুলে একটা দুর্গন্ধযুক্ত পাদ মারতে। কেন এমন ইচ্ছে হয়, ও জানে না। বুঝতে পারে নিশ্চয়ই এসব ওর অসুখেরই লক্ষণ। লক্ষণগুলো প্রতিদিন একটু একটু করে বাড়ছে।

রাস্তায় কোন চকচকে প্রাইভেট কার দেখলে নাকের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে ময়লা খুঁটে বের করে এনে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সন্তর্পনে গাড়ীর গায়ে লেপ্টে দেয় সে। ডান হাতের কনিষ্ঠা আঙ্গুলের আধ ইঞ্চি লম্বা নখটা ব্যবহার করে কানের ভিতরের খইল বের করে এনে, প্রথমে নাকে নিয়ে শুঁকে। এ গন্ধটা ভালো লাগে ওর। তারপর ময়লাটাকে দুই আঙ্গুলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ছোট্ট একটা বল এ রূপান্তরিত করে আবছে ছুড়ে মারে কারো গায়ে। শুধু তাইনা, শপিংমলের টয়লেট ব্যবহার করে ফ্ল্যাশ না করেই চলে আসে। কমোডে নিজের গু ভাসতে দেখে তৃপ্তি পায়। এ কিসের তৃপ্তি ওর! জানে না।

ও জানে না নিজের অজান্তে কখন মুখ থেকে লালা ঝরছে, ছুটতে শুরু করেছে বাসের জানালার দিকে। মহিলাটার মুখ থেকে দ্বিতীয় কিস্তির বমি বের হয়ে আসার আগেই পৌঁছাতে হবে তাকে। ছেলেটার মাথার ভেতরে শব্দেরা ঘুরপাক খেতে খেতে এলোমেলো জটপাকিয়ে যাচ্ছে। ‘ইয়েস, ইয়েস। আর একটু, আর একটু ধরে রাখো বমিটা। ছেড়ে দিওনা। এইতো আমি এসে গেছি।’ বাসের জানালার নিচে পৌঁছে মুখটা বড় করে হা করতেই মহিলা তার দ্বিতীয় কিস্তি বমি উগড়ে দিলো ছেলেটার মুখে। বমিতে গলে যাওয়া ভাত-তরকারির পরিমাণ কমে তারচেয়ে বেশি হলুদ বিজলা বিজলা লোতের পরিমাণ বেড়েছে। বমির লোত থেকে একটা টকটক স্বাদ টের পাচ্ছে। তার মানে শেষের দিককার বমিতে এসিডের মাত্রাও যুক্ত হয়েছে। সবতো আর মুখের ভেতরে যায়নি, বমিতে ছেলেটার সমস্ত শরীর ভিজে গেছে। সেখান থেকে একটা উৎকট গন্ধও ছড়াতে শুরু করে দিয়েছে। এবার ওর নিজের গা ঘোলাতে শুরু করে। ঘেন্নায় সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। প্রতিবারই মনে বলে সে, এবারই শেষ। আর কখনো এমনটা হবে না। আর না, আর না। যে করেই হোক এই বিকার থেকে বেড়িয়ে আসতে হবে ওকে।

ছেলেটা দৌঁড়ে যেতে চাইছিলো পার্কের দিকে। কিন্তু তার আগেই পেট গুলিয়ে বমির বেগটা তীব্র হয়ে উঠলে রাস্তার পাশে ড্রেনের ভিতর মুখ ঢুকিয়ে বমিটা ছেড়ে দিলো। তারপর পাশের স্তুপকৃত আবর্জনার উপর শুয়ে পড়ে। বমি পরবর্তী অবসাদ ওকে আবর্জনা ছেড়ে ওঠতে দিচ্ছিলো না। শুয়ে শুয়ে ও দেখতে পাচ্ছিলো একটা বাচ্চা মেয়ে সমেত গ্রামের মহিলাটাকে টেনে বাস থেকে নামিয়ে দিচ্ছে হেলপার। বাসের অন্য পেসেঞ্জারদের গায়েও বোধ হয় বমি ছিটকে গিয়েছিলো। বুকে আগলে রাখা ময়লা কাপড়ের একটা পুটলি, আরেক হাতে ধরে রাখা শহরের কাজের মেয়ে হতে আসা তার বাচ্চাটাকে নিয়ে এসে পড়লো জনসমুদ্রে। লক্ষ মানুষের ভিড় তখন শাহবাগ মোড়ে। মুহুর্মুহ শ্লোগান উঠছে। আকাশ বাতাস প্রকম্পিত। তারচেয়ে বেশি প্রকম্পিত হয়ে উঠছিলো প্রথম শহরে আসা বাচ্চা মেয়েটার মন। ও ভয়ে কাঁদতে কাঁদতে ছোট ফ্রকটা ভিজিয়ে প্রস্রাব করে দিয়েছিলো রাস্তার উপরে।

একদিকে মায়ের বমি অন্যদিকে মেয়ের প্রস্রাব, সব মিলিয়ে তুমুল হইচই ছেলেটার মগজের মোড়ে। ওর মাঝে মাঝে মনে হয়, গ্রামের মহিলাগুলো ঢাকা শহরে আসেই শুধু বমি করতে। এ যাবৎ যত বাচ্চা, মহিলা বা পুরুষদের বাসে বমি করতে দেখেছে তার অধিকাংশই ছিলো গ্রাম-মফস্বলের মানুষ। শহরের প্রথম ধাক্কাটা কিছুতেই সামলে উঠতে পারে না।

আর বাচ্চা মেয়েটা যে ভয়ে প্রস্রাব করে দিলো, এখনো মায়ের একটা হাত শক্ত করে ধরে কেঁদে চলেছে। বাচ্চাটার কথা কি বলবে, ছেলেটার মা বলতো, শ্লোগান শুনলে মায়েরও নাকি আগে এমন ভয় ভয় লাগতো গ্রামে। কিন্তু এখানে তো ভয়ের কিছু নেই। বরং এসব শ্লোগানে ওর সাহস বাড়ার কথা। তবু ইদানিং সমস্বরে শ্লোগান শুনলে কেমন ভয় ভয় লাগে ওর। মনে হয় আবার যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। রক্ত-আগুন-বোমা, ওহ! ভাবলেই ভয়ে বাচ্চাটার মতো প্রস্রাব করে ফেলতে ইচ্ছে হয়।

শাহবাগের জনসমুদ্রে হঠাৎ পরে গিয়ে মা মেয়ের গ্রাম্যতা কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছিলো না। কোন দিকে যাবে ওরা, কোনটা ওদের পথ? আর বাচ্চা মেয়েটা তখনও মায়ের হাত ধরে কেঁদেই চলেছে। বমি খাদক ছেলেটা বাচ্চাটাকে কী বলে সান্তনা দেবে ভাবতে ভাবতে ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেল। যেয়ে বাচ্চাটাকে বললো, ‘আমি রেসকোর্স ময়দান চিনি। ওখানে তোমার ঘোড়াটাও ছিলো। এতো মানুষের ভিড়ে এখন আর খুঁজে পাচ্ছি না।’

[লেখাটি সাহিত্য পত্রিকা-ওঙ্কার ২০১৫ ফাল্গুন সংখ্যায় প্রকাশিত]

Amal akash
অমল আকাশ

গল্পকার, সংগঠক ও চিত্রশিল্পী। ফটোক্লিক : রিপন দাস

বিভাগ

কবিতা

error: Content is protected !!
We use cookies to personalise content and ads, to provide social media features and to analyse our traffic. We also share information about your use of our site with our social media, advertising and analytics partners. View more
Cookies settings
Accept
Privacy & Cookie policy
Privacy & Cookies policy
Cookie name Active

🍪 We Use Cookies

Our website uses cookies to improve your experience. They help us remember your preferences and analyze traffic. Some cookies are essential, while others help us optimize content. By continuing to browse, you agree to our use of cookies. You can manage cookie settings in your browser.

Save settings
Cookies settings
Scroll to Top