ওঙ্কার

ঐ যায়; ঔপন্যাসিক যায় – হাসান জাফরুল

Post Views7 Total Count
0Shares
হাসান জাফরুল

সত্যাজিত রায়ের আঁকা স্কেচে মানিক বন্দোপাধ্যায়।

সত্যাজিত রায়ের আঁকা স্কেচে কথাসাহিত্যিক মানিক বন্দোপাধ্যায়।

আকাশ মন্দ নয়

আকাশটাকে বিকার বলো না, নতুন কবি।

মৃত কবিরাই মাটিতে দাঁড়িয়ে

আকাশে হাত বাড়ায়।

[ডায়েরীর পাতা, ২ মার্চ ১৯৪৯, খসড়া কবিতা]

ঠিক সে মাসটার প্রথম দিনেই বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী নিজেকে হত্যা করিয়াও প্রমাণ করিতে পারেন না তিনিই সেই বিপ্লবী- ঔপনিবেশিক বীর পুঙ্গবেরা আস্ত দেহ মাথা থেকে কেটে কাচের জারে করে রওয়ানা দেয় কলকাতার দিকে। একই দিনে ক্ষুদিরাম বসুও গ্রেফতার হন। শুধু কি এই- মুরারী পুকুর রোডের বাগানবাড়ী থেকে গ্রেফতার হলেন বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্রকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়, কানাইলাল দত্ত, সত্তেন্দ্রনাথ বসু, হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ। এই ডামাডোলের ভিতর প্রকৃতিও স্তব্ধ হয় নাই। …কলকাতা শহরের বাঈজী পাড়ায় লোক সমাগম একটুও কমে নাই, আবার কলকাতার হকাররা রাস্তায় চেঁচিয়ে বেড়াচ্ছে – ‘ক্ষুদিরামের বিচার শুরু’। এরই এক ফাঁকে কলকাতা থেকে দূরে সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে ১৯০৮-এর ১৯ মে জন্ম নেবেন এক শিশু, মা-বাবা নাম রাখবেন প্রবোধকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি দুমকায়ই জন্মাবেন… তিনিই পড়ে নন্দকে রোধ উগড়ে বর্ণনা করবেন- “কলকাতা শহর! মোটরে চাপিয়া কলকাতা শহর গাওদিয়ার দিকে চলিল।” এভাবেই উগড়ে দেবেন ঘৃণা, বিসর্জন দেবেন বিশ্বাস, খুঁজে ফেরবেন আশ্বাস আর শেষপর্যন্ত পুড়ে পুড়ে খাক হবেন যিনি, তিনি প্রবোধকুমার নন, আমাদেরই মানিক- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।

তার ডাকনাম ছিল মানিক, প্লান ছিল লেখক হবেন- লেখা শুরু করবেন ৩০ বৎসর বয়সের পরে সবদিক থেকে প্রস্তুতি নিয়ে। প্রস্তুতির জন্য সতেরো বছর বয়সে কবিতার খাতা তৈরি করলেন। প্রথম পৃষ্ঠার উপরে লিখলেন I am not a ghost of the past, আর নিচে লিখলেন Love! Scientist does not explain love! কারণ তার ছিল ‘কেন’ প্রশ্ন করার বৈজ্ঞানিক ধাত, আবার তার ভালবাসাও যে প্রচণ্ড তীব্র! বাদ সাধলো ঐ গল্পটা- ঐ যে “অতসী মামী” নিয়ে যে মিথটা প্রচলিত। গল্প লেখার গল্প হল- বন্ধুদের সাথে বাজী ধরলেন এবং লিখলেন “অতসী মামী”, শুধু লিখলেনই না, প্রবোধকুমার নামের সেই যুবক ভাল ছদ্মনাম খুঁজে না পেয়ে ডাক নামেই পাঠিয়ে দিলেন “বিচিত্রা” নামের বিখ্যাত পত্রিকা অফিসে। পরে যাতে ভাল লেখা লিখলে এ-গল্পের দায়িত্ব নিতে না হয়! এ যেন স্রেফ গল্প লেখকের গল্প… গল্পময় জীবন- গল্প শেষ জীবন শেষ। আরব্য রজনীর সেই শাহজাদীর মত, যে কিনা জানে গল্প ফুরোলেই মৃত্যু… খেয়ালী রাজার হাতে… সমাপ্তি? কার…? শুধুই শাহজাদীর? না আমার-আপনার-সব্বার? তাই গল্প হতেই থাকে…

ওই মুখগুলি-মধ্যবিত্ত আর চাষাভূষো- ওই মুখগুলি আমার মধ্যে মুখর অনুভূতি হয়ে চ্যাঁচাতো- ভাষা দাও-ভাষা দাও।

আমি কি জানি ভাষা দিতে?

[গল্প লেখার গল্প : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়]

ফলত: কি হয়… প্রথম গল্প লিখেই কিস্তিমাত্। পড়াশোনা শিকেয় উঠে… লিখতেই থাকেন অবিরত… লিখতে লিখতে টেবিলেই জ্ঞানশূন্য হয়ে যান। ধরা পড়ে মৃগীরোগ… তা থেকে বাঁচতে ওষুধ খাওয়া… ওষুধের ক্লীবতা থেকে বাঁচতে মদ খাওয়া… তারপর… অসুস্থতা…, অসুস্থতা থেকে মুক্তি লাভের চেষ্টা – রাজনীতি করা… মা কালির ভক্ত হয়ে যাওয়া… শেষমেষ সাহিত্যই হয়ে ওঠে তার জীবনের ‘কেন’।

দুই.

আড়াই বছর বয়স থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গির ইতিহাস আমি মোটামুটি জেনেছি।

[কেন লিখি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়]

কি ইতিহাস জানতেন? আবার ঐ রচনায়ই জানান “আমি যা জেনেছি এ জগতে কেউ তা জানে না” কি জানতেন তিনি? এটা কি মানসিক রোগ? ম্যাগনোম্যানিয়া? নাকি সবসময় উচ্চ রক্তচাপ বহন করে বেড়ানোর ফল (মৃগীরোগ)? নাকি আরো অতিরিক্ত কিছু? আবার রহস্যের কোন রাখঢাক না করেই পষ্টাপষ্টি আমাদের জানিয়ে দেন- প্রতিভা নিয়ে জন্মগ্রহণ করার কথাটা বাজে- তবুও আড়াই বছর বয়সে কি ইতিহাসই বা জানে মানুষ?

পিতা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি থেকে জানা যায়- তারা ছিলেন পুরোহিত বংশের ছেলে। তিনি কষ্টে-সৃষ্টে পড়াশুনা করেন। কলকাতায় কিছুকাল শিক্ষকতা করার পর একাউন্টস ক্লার্ক হিসাবে সরকারি কর্মে যোগ দেন। পরে আরো কিছু চাকুরির বদলের পর ১৯০৬ সালে সেটেলমেন্ট বিভাগে কানুনগো পদে নিযুক্ত হন-সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে চাকুরী জীবনের শেষ কিছুটা সময় অতিবাহিত করেন। সেসময়ই মানিক জন্মগ্রহণ করেন। এবং পরে সাব ডেপুটি কালেক্টর পদে উন্নীত হন। স্বপ্ন সফলের উদ্যাপন করেন এভাবে- “এত কালের পর আশা ও নিরাশার মধ্য দিয়া ভগবান আমার বহুকালের ব্যাপারটি ঘটতে থাকে ঔপনিবেশিক বাতাবরণে। বিদ্যাশিক্ষার মাধ্যমে এ শ্রেণীটি বিদেশী শাসকগোষ্ঠীর সাথে লেনদেনের সম্পর্ক গড়ে তোলে। কৃষিভিত্তিক সভ্যতা থেকে আধুনিক মধ্যবিত্ত সম্পর্কের এই রূপান্তর একইসাথে ঘটায় মানবিক সম্পর্কের অবমূল্যায়ন। মধ্যবিত্ত জীবন ধারণের জন্য বিদ্যাশিক্ষা- নিরাপত্তার বাতাবরণ একইসাথে ক্ষয় ও শূন্যতার অভিজ্ঞতা- মানিককেও একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল। হরিহরের পরের প্রজন্মেই তার স্থিতি তার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। “বাবা নাকি দাদার জন্য কিছুই করেনি- স্কলারশিপের টাকায় পড়েছে! সেটা যেন সম্ভব… আমি ছোটবেলা থেকেই জানতাম। টাঙ্গাইল থেকে তাই লিখেছিলাম সেই পত্র- যা পড়ে দাদা আগুন। [ডায়েরী-২৫ জানুয়ারি]

প্রথম হইতেই আপনি কতকগুলি বিলাতি সামাজিক ও সাংসারিক রীতিনীতি অনুসরণ করিয়া আসিয়াছেন। [দাদাকে লেখা সেই চিঠির অংশ]

এই যে হরিহর পরিবারের বেড়ে ওঠা, কৃষিভিত্তিক সমাজের পুরোহিত থেকে চাকুরিজীবি মধ্যবিত্ত হিসেবে গড়ে ওঠা- ভাঙন, এটাকে আমাদের মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সামাজিক উত্থাণ ও ভাঙনের সাথে মিলিয়ে দেখতে হবে।

তিন.

আশা নিয়ে ভাষা আর ঘৃণা নিয়ে কবি

তাই আরো ঘৃণা চাই

[নতুন ঘৃণার প্রথম কবিতা]

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তার সাহিত্যিক জীবনে লেখেন ৩৭টি উপন্যাস। প্রায় দুই শতাধিক গল্প, বেশকিছু কবিতা, অল্পকিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ এবং একটি আত্মজীবনীমূলক প্রবন্ধের বই। এছাড়াও তার ডায়েরী চিঠি-পত্রতো রয়েছেই।

প্রথম উপন্যাস লেখেন ‘দিবারাত্রির কাব্য’। যদিও তা ছাপা হয় “জননী” উপন্যাসের পরে। প্রথম দিককার লেখাগুলোর মধ্যে ভাষার ব্যবহার, প্রকাশভঙ্গি, টেকনিকের ভাঙচুর নিয়ে গড়ে উঠতে থাকে তার নিজস্ব ভাষা। “দিবারাত্রির কাব্য” চলতি ভাষায় লেখা, “জননী” সাধু ভাষায় লেখা। এ-কি শুধুই রীতির মধ্যকার সমস্ত সম্ভাবনাকে পরখ করা? আবার সাধু ভাষায়ই লিখছেন তো কথ্য ভাষার মূল অংশ ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। ভাষা বাস্তবতাকে যেমন পুরোপুরি প্রকাশ করে না, তেমনি ভাষা নিজেই এক বাস্তবতা – এক রীতি। আবার সাহিত্যের প্রকাশেরও রয়েছে নিজস্ব বাস্তবতা। এসবের মধ্যেই যেমন একজন লেখক দাঁড়ান, আবার অবিরত এসব থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টাও করেন। যা গড়ে তোলে এমন একটা কিছু যাকে আমরা সাধ করে বলি নিজস্ব স্টাইল।

অত সহজে ভুলিবার মেয়ে ভিখারিনী নয়। খানিকটা তামাক পাতা মুখে গুজিয়া সে বলে- দু’দিন বাদে মোরে যখন খেদাইয়া দিবি, ঘা মুই পামু কোয়ানে?

এদিকে আকাশে চাঁদ ওঠে, নদীতে জোয়ার ভাটা বয়, শীতের আমেজে বায়ুস্তরে মাদকতা দেখা দেয়।

‘উঠে’ ক্রিয়াপদের পরেই বসে গেছে ‘বয়’, আবার ‘বায়ুস্তরে মাদকতা’ অর্থাৎ সাধু-চলিত কথা ভাষার মূল অংশ মানিক এমনভাবে ব্যবহার করেন যে তা স্বস্তিকর হয়ে ওঠে না পাঠকের কাছে। মানিকের সাহিত্যকর্ম দু:সাহসিক অস্বস্তিকর, তা শুধু তার বিষয়-এর জন্য নয়, ভাষার জন্যও তা। এই খেলা আর কে খেলিয়াছে তার মত? আর তার গল্প-উপন্যাসে প্রতিবেশের বর্ণনা in detail যাকে বলা হয় সেরকমও পাই না। বরঞ্চ দেখি সংকলিত দৃশ্যের সম্পাদনা। এদিকে আকাশে চাঁদ উঠে, নদীতে জোয়ার ভাটা বয়, শীতের আমেজে বায়ুস্তরে মাদকতা দেখা দেয়। ভিখুর চালার পাশে কলাবাগানে চাপা কলা কাদি শেষ হইয়া আসে। বিন্নু মাঝি কলা বিক্রির পয়সায় বৌকে রুপার গোট কিনিয়া দেয়। তালের রসের মধ্যে নেশা ক্রমেই ঘোরালো ও জমাট হইয়া উঠে। ভিখুর প্রেমের উত্তাপে ঘৃণা উবিয়া যায়। [প্রাগৈতিহাসিক : মানিক বন্দোপাধ্যায়]

শব্দের পর শব্দ, দৃশ্যের পর দৃশ্য যেন লেখককে গেঁথে চলেছে আর পেছনে পড়ে থাকে বাস্তবতা। এই যে প্রকাশপ্রক্রিয়া, এর দৃষ্টি কখনো বাস্তবতার নিরবিচ্ছিন্ন প্রকাশের দিকে নয় বরং বাস্তবতাকে আক্রমণ করার দিকেই ঝোঁক বেশি। না হলে – চাপা কলার কাদি শেষ হইয়া আসা আর ভিখুর প্রেমের উত্তাপে ঘৃণা উবিয়া যাওয়ার মধ্যে সম্পর্ক কি? এই যে টুকরো টুকরো দৃশ্য গেঁথে গেঁথে প্রকাশকে তীব্র করার জন্য লেখক এ পদ্ধতি গ্রহণ করেন। তবুও কেন জানি, মানিকের পরিচয় নিরেট বাস্তববাদী হিসেবে রটে গেল – আশ্চর্য! এটি মানিক রচনা পাঠের ক্ষেত্রে বাধাই তৈরি করে। মানিকের গল্প-উপন্যাসের বয়ান পদ্ধতি প্রথমেই বাস্তবকে আক্রমণ করে, বাস্তবকে ভাঙ্গে, টুকরো টুকরো করে বাস্তবোত্তীর্ণ করে তার অভিঘাত তীব্র করে তোলে পাঠকের কাছে।

চার.

মানিক বন্দোপাধ্যায়ের “দিবরাত্রির কাব্য” তার একুশ বছর বয়সের রচনা। প্রথম উপন্যাস। “সাধ করলে কবি হয়তো আমি হতেও পারি। কিন্তু ঔপন্যাসিক হওয়াটাই আমার পক্ষে হবে উচিৎ ও স্বাভাবিক।” [উপন্যাসের ধারা-মানিক বন্দোপাধ্যায়] এটা নিজের কাছে প্রমাণের জন্য এতই খাটাখাটনি করেন যে লেখার টেবিলেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান, ধরা পড়ে মৃগীরোগ। diba ratrir kabbo ঐ কয়েকটি বছরকে পরে মানিকই উল্লেখ করেন ‘প্রাণান্তকর’ বলে। যাই হোক দিবারাত্রির কাব্য তিনটা ভাগে ভাগ করা- দিনের কবিতা, রাতের কবিতা, দিবারাত্রির কাব্য। দিনের কবিতা অংশে হেরম্ব-সুপ্রিয়া, রাত অংশে হেরম্ব-আনন্দ আর দিবারাত্রির অংশে দিন রাত যেন ভেদাভেদহীন। এ উপন্যাস কি নিয়ে লেখা? সহজ উত্তর, লেখকই ভূমিকায় বলে দিয়েছেন, “প্রেম” নিয়ে। এও বলেছেন একুশ বছর বয়সেই নাকি এরকম, শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে লেখা যায়! তবু এ “প্রেম” ঐ সময়ের অভ্যস্ত পাঠকের জন্য বিপদ এ কারণে যে- এ প্রেম কোন মহত্বকে সঙ্গী করে না বরং ব্যাপারটা দাঁড়ায় ঐ পেয়াজ ছোলার মত; খোসা ছাড়াতে একসময় হাতে কিছুই থাকে না। মানিক এ উপন্যাসে যে ভূমিকাটা দিয়েছেন (আত্মপক্ষ সমর্থনে!) তাতে এও বলেছিলেন-“চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection -মানুষের এক টুকরো মানসিক অংশ।” আত্মপক্ষ সমর্থনে আরও জানান- “বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি দাঁড়ায়, সেইগুলিকে মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে।” প্রথম উপন্যাসেই মানিক যেন Fiction আর Reality দ্বন্দ্বে হাবুডুবু খাচ্ছেন। দ্বিধান্বিতও ছিলেন খানিকটা, না হলে প্রথমে লিখেও কেন পুস্তকাকারে পরে বের করলেন। আবার প্রথম সংস্করণে “একটি বস্তুসংকেতের কল্পনামূলক রূপক কাহিনী” উপশিরোনাস হিসেবে লেখে বাদ দেবেন। এটা গুরুত্বপূর্ণ শুধু তথ্য হিসেবে নয়- আরও অতিরিক্ত কিছু…।

আনন্দ হাসলো। “অতো বোকা নই, বুঝলেন? এমনি করে আমার কথাটা এড়িয়ে যাবেন, তা হবে না। রোমিও জুলিয়েট বেঁচে থাকলে তাদের প্রেম অল্পদিনের মধ্যে মরে যেত, আপনি কি করে জানলেন বলুন?

বুদ্ধি দিয়ে জানলাম। হেরম্ব জবাব দিল।

“শুধু বুদ্ধি দিয়ে?”

“শুধু বুদ্ধি দিয়ে আনন্দ! বিশ্লেষণ করে!”

“এরা কেউ বিশ্লেষণ ভালোবাসে না” বিন্তু কি বিশ্লেশণ করে হেরম্ব? না, নিজের অপরকে? তার কাছে বিশ্লেষণ কি নিজের সেই হারানো ছেলেবেলার মাঝেই ঘুরপাক খায়না; জীবনকে পরিপূর্ণ করা উপায় তার নেই, তাই সুপ্রিয়ার মাঝে নিজেকে দান করতে পারেনা। “নিজের কথা ভুল করে ভেবে এতদিন জীবনটা অপচয়িত হয়ে গেছে। এখন নির্ভুল করে ভাবতে গেলে রাত্রিটা তাই যাবে।” এ যেন জমাট অন্ধকারে দুই হেরম্ব- যার আত্মক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধ চলে- কড়িকাঠের সঙ্গে দড়ি বেঁধে ফাঁস লাগিয়ে নিজের স্ত্রীর ঝুলে পড়ার অতর্কিত স্মৃতির হানা- তার একাকীত্ব- আউটসাইডার ভাব-তার বিপরীতে কখনো সুপ্রিয়া কখনো আনন্দ, কখনো মালতী আবার কখনো তার ছেলেবেলার মাস্টারমশাই-অনাদি। যদি সুপ্রিয়া হয় বাস্তব তবে আনন্দ কল্পনা। বিশ্লেষণে যা ধরা পড়ে না, অনুমান দিয়ে আবিষ্কার তবে গ্রহণ করার শক্তি তার নেই। আনন্দ আত্মহত্যা করে কেন? হেরম্ব কি আনন্দকে ভালোবাসত?

“সত্যবাবুর মেয়ের (মালতী-আনন্দের মা) মধ্যে যতটুকু অর্জন ছিল, যতখানি গুণ ছিল, শুধু সেইটুকুই সে নকল করেছে। মালতীর নিজের অর্জিত অমার্জিত রুক্ষতা তাকে (আনন্দকে) স্পর্শ করেনি।”

মালতীর অর্জিত রুক্ষতা হয়ে উঠলো মালতীর নিজের, আর যখন মালতীল রুক্ষতা ছিল না- সেই হেরম্বের ছোটবেলায়- যখন সে পাগলের মত মালতীকে বিয়ে করতে চেয়েছিল তখন যে রূপ হেরম্ব আবিষ্কার করেছিল- তখন তা কার ভাব ছিল? তা কি হেরম্বের নিজেরই নয়? যে রূপ এখন খুঁজে ফিরে আনন্দের মধ্যে তা কি তার ছোটবেলার মালতীকে নয়। আর এখানেই হেরম্ব নাকি লেখক নিজেই অস্তিত্বহীন বোধ করতে থাকে, সাথে জগতশুদ্ধ- “মানুষ তার আসল কাজটাই জানে না- ও নিজেও জানে না- হায়! এ জগত কেবলি মায়া।” হেরম্ব বিশ্লেষণ করতে ভালোবাসে, বিশ্লেষণই তার আরাধ্য; যা শিক্ষিত হওয়ার মধ্যদিয়ে সে অর্জন করেছে। Reasoning পাশ্চাত্য সভ্যতার এক বড় দান। আর আনন্দ? আনন্দ বড় হয় বৈষ্ণব পরিবারে, হেরম্বের চেনা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে- সরলতার মধ্যে। এও জানা যে তার মা-বাব প্রথাগতভাবে বিবাহিত নয়- তাদের সামাজিক স্বীকৃতি নেই। আবার চিন্তা পদ্ধতিগতভাবে সে তার সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে যুক্তির উপর নির্ভর করে না। ভালবাসা ক্ষণস্থায়ী- এ সত্যের মুখোমুখি আনন্দ, যে তার মা-বাবার জীবনেও দেখেছে সত্যকে রূপায়িত হতে। আনন্দের কাছে বাঁচা, ভালোবাসা- বর্তমানতায় সমর্পিত- যা এ অঞ্চলের শত শত বছরের গড়ে ওঠা চিন্তাধারার মধ্যেই আছে। হেরম্ব যদিও মানুষের ভালোবাসার ধারাবাহিকতায়, ভবিষ্যতের আশ্বাস ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে বোঝাতে চায় তবু আনন্দ আর এসব বহন করতে রাজী নয়।Putul_Nacher_Itikatha_Manik_bandopadhya

‘আমি কি ভাবছি জান?’

‘কি ভাবছ আনন্দ?’

‘ভাবছি, আমারও যদি একদিন মা’র মত দশা হয়!’

হেরম্ব সভয়ে বলল, ‘ওসব ভেব না, আনন্দ।’

‘মানুষের ভাগ্যে আমার বিশ্বাস নেই। তোমার সঙ্গে ক’দিনের পরিচয়, এর মধ্যে আমার শান্তি নষ্ট হয়ে গেছে। দু’দিন পরে কি হবে কে জানে।’

হেরম্ব’র বিশ্লেষণ যেন বিশ্লেষণের মাঝেই ঘুরপাক খায়, কারণ অনুমান, অভিজ্ঞতা, মানব মনের অন্য তোন বৃত্তি দিয়ে সে সত্যকে অনুধাবন করতে পারে না। সে তার ছেলেবেলার কাছে ফিরে যেতে চায়।

তো আনন্দ জামা খুলে নগ্ন হয়ে আগুনকে নিয়ে নাচতে নাচতে আগুনেই ঝাপ দেয়। হেরম্ব বিস্মায়ষ্টি হয়ে বাধা দিতে পারে না। সে উপন্যাসের প্রথম থেকেই Falling Figure -পরবাসী একাকীত্ববোধাক্রান্ত-ঔপনিবেশিক দেশের ইংরেজি সাহিত্যের মাস্টার…

হায়! হেরম্ব, এখন তুমি কি করিবে?

যাও, এগোও চিতার দিকে- সেখানে আনন্দ আছে, তোমার ছেলেবেলার রূপকথা।

পাঁচ.

শরীর! শরীর!

“তোমার মন নাই কুসুম”

আকাশের হুংকারে হারু মারা গেল। শান্ত নিস্তরঙ্গ জীবনে আকস্মিক ঘটনা প্রায়ই ঘটে মানিক বাবুর উপন্যাসে। তা এমনই যে- রুক্ষ চামড়া ঝলসিয়া গেল পুড়িয়া গেল যার- তার মুখ ছিল বসন্তের দাগভরা- এই হচ্ছে ঘটনার পূর্ব-পরের তফাৎ। তাতে কি হয়- সবুজ রঙের সরু লিকলিকে সাপ ক্ষণকাল স্থিরভাবে কুটিল অপলক চোখে হারুর দিকে চাহিয়া থাকিয়া তাহার দুই পায়ের মধ্য দিয়াই বটগাছের কোটরে অদৃশ্য হইল। হারুর নিস্পন্দতায় কাঠবিড়ালী নামিয়া আসে, গিরগিটি পোকা আয়ত্ত করে। শিয়ালও মরা শালিক গিলিয়া ফেলার মুহূর্তে হারুকে দেখে। ওরাও টের পায়; আর এই টুকরো টুকরো সংকলিত দৃশ্যের মধ্য দিয়ে লেখক জানান দেন হারুর দেহখানি ধাপাস করিয়া পড়ে- তা কি আমাদের উপরই পড়ে? ঠিক এইখানে আকস্মিকতা জীবনকে বিপর্যস্ত করিয়া যা দাঁড়ায় তাতে প্রবেশ করে শশী- গাওদিয়া গ্রামের ডাক্তার শশী। গাওদিয়ার (ক্রমপুরেরই এক গ্রাম- মানিকবাবুর মাতুলালয়, অদ্ভূত ব্যাপার সেই গ্রামে এখনও একজনই ডাক্তার বসবাস করে যিনি শশী নামের কাউকেই চিনেন না।) একমাত্র উচ্চ শিক্ষিত লোক। এই গাওদিয়ায় বড় হইয়া সে পড়াশুনা করতে কলকাতা গিয়াছে- সেখানে থাকিবার সময় তাহার অনুভূতির জগতে মার্জনা আনিয়া দিয়াছে বই আর বন্ধু। সেই গ্রামে আবার সে ফিরিয়া আসিয়াছে। আকস্মিকতা? এই আসিয়া শশীর মনে হয়, “কারু স্বাতন্ত্র নাই, মৌলিকতা নাই, মনের তারগুলি একসূত্রে বাঁধা। সুখ-দু:খ এক; রসানুভূতি এক, ভয় ও কুসংস্কার এক। হীনতা ও উদারতার হিসাবে কেউ কারো চেয়ে এতটুকু ছোট বা বড় নয়।” এক প্রবল বিচ্ছিন্নতা আক্রান্ত শশী, যে বিচ্ছিন্নতা ভাঙতে চায়- তার মাঝেই ক্রমে ক্রমে মূর্ত হতে দেখি গাওদিয়া- যা মানিকবাবুর মাতুলালয়, ছোটবেলায় থাকতেন- মূর্ত হয় কলকাতা- ক্রমে ক্রমে রূপ পায় কুশ্রীকা ভীরুতা- অমরত্ম ডাঙ্গায় তোলা মাছের মত ছটফট করে দাপড়াতে থাকে। এইসব দ্বন্দ্বে তাকে সবসময় পীড়িত হতে দেখি। এমনকি নন্দকে কিলঘুসি মারিয়া অচৈতন্য করিয়া ফেলে কারণ বিবাহ করেও সে তার বোন বিন্দুর সহিত পতিতার মত আচরণ করে। তবে সে শুধু কল্পনায়। কল্পনা তাকে এতটাই বিচলিত করে যে, সে সান্তনা খুঁজে- ঠিক পরেই ভাবে- “তবু, নন্দ হয়তো বিন্দুকে ভালোবাসে”। এটাই তার ব্যক্তিত্ব।

এমনকি লেখক সরাসরি আক্রমন করেন না তাকে! “তাহার ইন্টেলেকচুয়াল রোমান্সের পিপাসা, যাহা চা’য়ের ধোঁয়ার মত জলীয় বাষ্প ছাড়া আর কিছু নয়।” তার বিদ্যাশিক্ষা যখনি প্রয়োগ করতে যায়, কুন্দ বাধা দেয়- তার স্বাভাবিক অভ্যস্ততার ভিতর থেকে।

ডাক্তার শশীর কুসুমকে ভাল লাগে কারণ কুসুমের শরীর মজবুত।

আবার কুসুম নি:শ্বাস ফেলিয়া যখন বলে. “আপনার কাছে দাঁড়ালে আমার শরীর এমন করে কেন ছোটবাবু?”

আমারদের ছোটবাবুর তখন মনে হয়…

শরীর! শরীর!

“তোমার মন নাই কুসুম?”

সে শরীর খুঁজে না মন? সে কি কুসুমের মনের নাগাল-সারাক্ষণ এক দ্বন্দ্বে কাটাতে থাকে। আর এ সন্দেহ হওয়াও বিচিত্র নয়, সে আদতে ঐ মনের নাগাল পেতে চেয়েছিল কিনা। সে সাহসটা তার আদতে ছিল কিনা? শশীর আরেক সত্ত্বা কুমুদ-বড্ড চালিয়াত লোক। কলকাতায় থাকিবার সময় যে শশীর অনুভূতির জগতে মার্জনা আনিয়া দেয়। সে প্রায়ই কলেজে যাইত না, কথকতার মত হৃদগ্রাহি করিয়া ধর্ম-সমাজ-ঈশ্বর ও নারীর (ষোল-সতের বছরের বালিকাদের) বিরুদ্ধে যা মনে আসিত বলিত। সে যা চায়, তাইকরে… সব ভুয়া তার কাছে। প্রত্যাশাও নেই, চাওয়াও থাকতে নেই। স্রেফ স্রোতে গা এলিয়ে দিয়ে চলা। শুধু স্রোতটাতে ‘আমিত্ব’ আবিষ্কার করলেই হল। শশী বা কুমুদ কেউই নিজেদের আকাঙ্খাকে সমাজে মূর্ত করার জন্য নিজেদের ধ্বংসকারী আত্মপ্রচেষ্টা নেয় না। শিক্ষিত ডাক্তার যখন গ্রামীন সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর মধ্যে পবেশ করে – বাঁধা পায় স্বাস্থ্য উপদেশ দিতে গিয়ে… অক্লেশে ভাবতে পারে- ওরা অস্বাস্থ্য জলাভূমিকর কবিতা। গোপাল লোক ভাল নয়- এটা শশী জানে। কিন্তু সে তার বাবার প্রভাবকে অস্বীকার করতে পারে না। আদর্শ এবং নৈতিকতার সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্কও বড় হয়ে দাঁড়ায় শশীর কাছে। এ প্রবন্ধের প্রথমেই মানিকবাবুর পরিবারের যে শিক্ষিত হওয়ার প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছি, যা আমাদের সামাজিক ইতিহাসের অংশ তারই ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া যেন রূপায়িত হতে থাকে। শশীর পারিবারিক ইতিহাসে? শশী শিক্ষিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে সাংস্কৃতিক ধারণায় অবস্থান করে তার সাথে গ্রামবাসীর বিচ্ছিন্নতা দিয়ে?

যাদবের স্বেচ্ছা মৃত্যুজনিত কারণে যাদবেরই ইচ্ছায় শশী এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ পায়, শুধু তাই নয়- দ্বিধান্বিত শশীর জন্য জীবনকে সার্থক করার এক সুবর্ণ সুযোগ ঘটে তা হল- হাসপাতাল নির্মাণ এবং তার দেখাশোনা করা। সবচাইতে মজার ব্যাপার যাদব কিন্তু ডাক্তারি প্রথার বিরুদ্ধে… আশ্চর্য যে, সেই যাদব কিন্তু শশীকেই বেছে নেয়। এটা কি শুধুই যাদবের খেয়াল- ব্যক্তিগত সম্পর্কের জয়? না যাদবের সাংস্কৃতিক যে ধারণা তার পরাজয়?

“কি বলছো শশী? শেষকালে পালিয়ে যাবো?

পালিয়ে কেন? তীর্থে যাবেন।”

তীর্থেও যায় না, যাদব পালিয়েও যায় না, কিন্তু স্বেচ্ছামৃত্যু বেছে নেয়। সেও বাঁচার সুযোগ কি খুঁজে না। সেও বাঁচার সুযোগ কি খুঁজে না? কিন্তু তারপরও পালায় না, তার অবসানে তারই দেয়া অর্থ সহায়তায় গড়ে ওঠে হাসপাতাল। তার সৌরবিজ্ঞান, হাজার বছরের রীতি, ভক্তবৃন্দের বিশ্বাস – সব শেষ হল এক লহ্মায়… যেন এক উন্মাদনায়। এই উন্মাদনা পুরোপুরি অমরত্মের আকাঙ্খা দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়? উন্মাদনা যেমন সত্য, আফিম যেমন সত্য যাদবের যে প্রথাগত বিশ্বাস, তার পরাজয় তাও সত্য; হয়তো তা ব্যক্তি শশীর কাছে নয় – কিন্তু শশী যে সাংস্কৃতিক ধারণায় বিশ্বাসী তার কাছে তো অবশ্যই।

আধিপত্যকারী অঞ্চল থেকে আসা ক্ষমতাসীন অগ্রসর সংস্কৃতি নিরন্তর দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয় প্রথানির্ভর সনাতন বা পশ্চাতপদ সংস্কৃতির সঙ্গে। প্রথমটি দ্বিতীয়টির উপর আধিপত্য বিস্তার করে, ক্ষেত্রবিশেষে নিশ্চিহ্নও করে। আবার এ দ্বন্দ্ব থেকে জন্ম নেয় সংস্কৃতির এক সঙ্কর ধারা। এই তিনটি ধারার ঘৃণাবর্ত যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আলোড়ন তৈরি করে তাই যেন ফুটে উঠেছে এ উপন্যাসে।

ছয়.

প্রাণ যায় যায়

জীবনের উৎস যাতে শত্র“তায়.

প্রাণ তাই আকাশ বাতাস মাটি সমুদ্রের সাথে

মিতালী করেছে জয়ে জয়ে;

জেনেছে সূক্ষতা আর বৃহত্ব বিরাট,

গড়েছে চেতনা।

আজও অবিরাম চলেছে গঠন।

এতো রূপকথা নয়

এ যে ইতিহাস।

[নতুন ঘৃণার প্রথম কবিতা]

বিভিন্ন শ্রেণীর বিশেষ সম্পর্কের ভিত্তিতে যেরূপ সমাজ ব্যবস্থা এই বিশেষ শ্রেণীর স্বার্থের অনুকূল সেই সমাজব্যবস্থাকে স্থাপন করা বা স্থায়ী করার কাজে লাগাই সাহিত্যের মূল কথা বলে সাহিত্য কখনোই একটি শ্রেণীর বিশুদ্ধ আবেগ বা অনুভূতিকে রূপ দেয় না, সমস্ত সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর বিশুদ্ধ আবেগ বা অনুভূতি এবং চেতনাকে (অনুভূতি ও চেতনা পৃথক কিন্তু পরষ্পর নিরপেক্ষ নয়) প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করার জন্য একটা সামগ্রিক জীবন দর্শনকেই রূপায়িত করে। [বাংলা প্রগতি সাহিত্যের আত্মসমালোচনা]

পদ্মানদীর মাঝি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তম উপন্যাস। এ উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৩৬ সালে। পর্বান্ত হিসাবে আমার আলোচ্য তিনটি উপন্যাস (মানিক কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন ১৯৯৪-এ, সেটা ধরে) প্রথম পর্বের। তবে এই পর্বান্তর খুব বেশি কাজে দেয় না বরং তা মানিক-পাঠে বাধারই সৃষ্টি করে। দু’পর্ব নিয়ে অনেক লেখাজোখাও আাছে। পরের পর্বে তার হাত দিয়ে আর “পুতুলনাচের ইতিকথা” বা “পদ্মানদীর মাঝি” বেরোইনি। অনেকে এর জন্য রাজনীতি করাটাকেই দায়ী মনে করেন। মানিকবাবুকে ব্যক্তিজীবনে অনেক প্রতিষ্ঠান বয়কটও করেছে এজন্য। তার ডায়েরী পড়লে তা বোঝা যায়। এরকম লেখাও দেখেছি, রাজনীতি করা মানে সাগরে ঝাপ দেয়া। তারা ইনিয়ে বিনিয়ে লেখকের স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে আনেন। কিন্তু এ প্রশ্নটার উত্তর কখনোই দেন না, লেখকের স্বাধীনতা জিনিসটাই বা কি? লেখক কি পেশাজীবি হিসাবে সমাজের মানুষদের অন্যান্যদের চাইতে বেশি স্বাধীনতা ভোগ করবেন? নাকি সৌখিন হিসেবে? স্বাধীনতাতো হাওয়াই ব্যাপার নয়, স্বাধীনতা মূর্ত হয় সমাজের বিদ্যমান পরিস্থিতির আলোকে। আর তাছাড়া পণ্যায়িত বুর্জোয়া সমাজে লেখক নিজেই পণ্য- তার আবার স্বাধীনতা! পাথরও হাসবে শুনলে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস অবশ্য মানিকের ‘ব্যক্তি’র রোগ নির্ণয় এবং রোগ নিরাময়ের পথ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে এর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছেন। রোগ নিরাময়ের সামাজিক বাস্তবতার অনুপস্তিতিই তার পরবর্তী কালের চরিত্রদের রক্তশূন্যতায় ভোগার কারণ। চরিত্রদের স্বতস্ফূর্ত বিকাশ আর হয় না, লেখকই যেন চরিত্রদের হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যান। এটাই ইলিয়াসের মত। কিন্তু আমাদের আপত্তি এই ভাগটা নিয়েই। মানিক কি এর আগে রাজনৈতিক ছিলেন না? শুধু ফ্রয়েড দিয়েই তার ঐ পর্বকে বিশ্লেষণ করা সম্ভব? মানিক যে ভাষায় যা প্রকাশ করেছেন, তা কি তার রাজনীতির অংশ নয়…

“সাধুরীতিতে লিখতে গিয়েও কি অবজ্ঞা তার প্রতি! অবলীলায় লিখছেন ‘বিয়াইয়াছে’। একবার লিখেছেন? হাজারবার লিখেছেন। বিয়াইয়া, রাগাইয়া, চেঁচাইয়া, জিমাইতেছে, ফুটাইতেছে-ক্রিয়াপদের একেবারে অন্তজ চেহারার সাধুরূপ লিখে যাচ্ছেন। সাধুরীতিটাকে গালাগাল দেয়ার মত।”

[ভাষারীতি: মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় : হাসান আজিজুল হক]

বাংলা ভাষার বিকাশের সাথে যে সম্পর্ক তাতে মানিকের অবস্থানই বা কোথায়? আর তাছাড়া রাজনীতিটাই বা কি? কই… তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতি নিয়ে তো কথা উঠে না! আসলে সব পর্বেই মানিক প্রচণ্ড রাজনৈতিক ছিলেন। পরবর্তীকালের আরেক প্রতাপস্পর্ধী ঔপন্যাসিক অমিয়ভূষণ মজুমদার যেমন পদ্মানদীর মাঝিকে রাজনৈতিক উপন্যাস বলেই ক্ষান্ত হননি, বাংলা সাহিত্যের তিনটি রাজনৈতিক উপন্যাসের একটি হিসেবে পদ্মানদীর মাঝিকে ধরেছেন। [সাহিত্য ও নীতি: অমিয়ভূষণ মজুমদার]

নিস্তরঙ্গ জীবনে আকস্মিকতা যে পরিবর্তন এনে দেয় – তার ফলে জীবন যেরকম দাঁড়ায়; আবার আগের বাস্তবতা ফিরিয়ে আনার অমানবিক চেষ্টা – ব্যর্থতা-এর বয়ান হয়ে উঠে এ উপন্যাস। “স্থানের অভাব এ জগতে নাই। তবু মাথা গুঁজিবার ঠাঁইও এ জগতে নাই।” এমনি সংকটে ঘোরে পদ্মা তীরবর্তী গ্রামের মানুষ। সংকটটাই জীবন – জীবনের আর কোন আলোড়ন যেন নাই। এক পাশবিক তীব্রতায় আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা পড়ে আছে পদ্মা তীরের মানুষ। তাই যেন কুবেররা সময়ই পায় না জীবন-জগত বোঝার, ব্যাখ্যা করার। অন্তত তার খুব বেশি পরিচয় পাওয়া যায় না এ উপন্যাসে। কুবের মুড়ি দেয় এক ছেলের হাতে-ভাগ করা নিয়ে ঝগড়া লাগে দুই ছেলে, কুবের চেয়ে দেখে আর ভাবে – নিজের ভাগ বুঝিয়া লইতে শিখুক। স্রেফ এটুকুই যেন জীবন!

আবার আমরা যখন বাস্তবতার নিরেট বয়ানের আকাঙ্খা দাবী করি, তার সাপেক্ষ বিচার কি ভ্রমের জন্ম দেয় না? মহান চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক কুমার ঘটক বলেছিলেন – মানিক বাবু বামুনের ছাওয়াল। অর্থাৎ মানিকবাবু মাঝিদের নিয়ে লিখবেন কিভাবে? আমরা আগেও দেখেছি ঔপন্যাসিক মানিক যেভাবে বাস্তবতার চয়ন করেন তা প্রথমেই বাস্তবতাকে ভেঙ্গে ফেলে, বাস্তব-উত্তীর্ণ হয়ে নতুন বাস্তবতার পানে ধাওয়া করে। ফলে তার অভিঘাত হয় তীক্ষ, প্রচণ্ড জান্তব। অথচ নিরেট বাস্তবতার দাবী যেন ঋত্বিক করছেন। অবশ্য তুলনাটা তিনি করেছেন ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর সঙ্গে। অনেকে আবার মাঝিদের সাংস্কৃতিক জীবন ঠিকভাবে না আসায় গোস্বা করে এও বলেছেন, মধ্যবিত্তের চোখে মাঝিদের জীবন দর্শন – এখানে মাঝি কুবের-এর চাইতে প্রেমিক কুবের অনেক শক্তিশালী!Padma_Nadir_Majhi_Manik_Bandopadhay

যাই হোক, পদ্মানদীতে আরও একজন আছে- হোসেন মিয়া। ঈশ্বরের সমান প্রতিদ্বন্দ্বি যেনবা স্বপ্ন দেখায়। অদ্ভূত ব্যাপার যখন লেখক প্রাগৈতিহাসিক, টিকটিকি, সরীসৃপ লিখছেন; হেরম্ব, শশী, গোপাল এদের আঁকছেন আর ষড়যন্ত্র করছেন সময়ের গোপন কথা ফাঁস করবের বলে। তখনই হোসেন মিয়া’র চরিত্র সৃষ্টি – একটু আশ্চর্যেরই। ঠিক মেলেনা। তার প্রতিদ্বন্দ্বি বাকী মানিক সাহিত্যতো বটেই, বাংলাসাহিত্যেরই বা আর ক’জন আছে, স্বপ্ন দেখায়। কেতুপুর গ্রামে তার বাড়ি নয় – তার অতীত রহস্যময় – অনেক পোড় খাওয়া মানুষ। নোয়াখালী অঞ্চল থেকে এসেছে। খেয়াল করি উপন্যাসে তার প্রথম আগমন – কুবের ভয় পায় – এক দুর্জ্ঞেয় আশঙ্কা অনুভব করে – আর হোসেন যখন চলে যায় তখন উপস্থিত দেখি রাসুকে – ময়নাদ্বীপ থেকে পালিয়ে আসতে। ছোট্ট ঘটনা, হোসেন উপস্থিত না থেকেও উপস্থিত যেনবা; উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির দৃশ্যমানতা যেন ভেঙ্গে পড়ে। সে উপনিবেশ তৈরি করতে চায় ময়নাদ্বীপে – সে আত্মনিষ্ঠ আর ধনী-এর সাথে মিলে তার জীবনের অভিজ্ঞতা – ফলে সে হয়ে ওঠে আরেক নিয়তি – জেলে পাড়ার কাছে। ভাঙাচোরা মানুষ দিয়ে গঠন করতে চায় এক নতুন উপনিবেশ। এই ভাঙাচোরা মানুষ নিয়ে তার আগ্রহ নেই, তার আগ্রহ নতুন মানুষ নিযে যা গড়ে উঠবে এদের দ্বারাই। হোসেন মিয়া কবি। একটা গীতই আছে উপন্যাসে। তার সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ যেনবা।

আঁধার রাইতে আসমান জমিন ফারাক কইরা থোও

বোনধু, কত ঘুমাইবা।

বাঁয়ে বিবি ডাইনে পোলা-আকাল ফসল রোও

মিয়া, কত ঘুমাইবা

মানের পাতে রাইতের পানি হইল রুপার কুপি,

উঠ্যা দেখবা না।

আলা ঘরের চালা কেডা চুপি চুপি

দিশা রাখবা না।

তোমার লাইগা হাওর দিয়া বাইয়া চেরাগ নাও

দিল-জাগানি আলেন যিনি, মিয়া,

চিরা মেঘের বাদাম তুইলা বন্ধু কনে যাও?

জিগায় তারে খাঁচার চিড়িয়া।

নিদ্ ভাঙে না, দিল জাগে না, বিবির বুকের শির,

পাড়ি দিবার সময় গেল, মাঝি তবু থির

মাঝি কত ঘুমাইবা।

-গানটা কুবেরকে শোনায়? কুবের হায় কুবের বুঝতে পারে কি এ আহ্বান? মাঝি সে – কপিলাই তাকে এক হাটে কিনে আরেক হাটে বিক্রি করে দেয় – সে কি আর এসব বোঝে? কিন্তু মাঝিপাড়া তার সাথে হোসেনের সম্পর্ক কি? হোসেনকেই বা কিভাবে বিচার করবো? হোসেনের স্বপ্ন আর কুবেরদের অসহায়ত্ব, ভয় – এই দু’য়ের বিচারইবা কি? সম্পর্কইবা কি? তারা ভাঙাচোরা মানুষ কিন্তু তাদের মধ্যেই জন্ম নেবে এক কল্পিত সমাজের সম্ভাবনাময় মানুষ। স্বপ্ন হিসাবে দুর্দান্ত। এই স্বপ্নে কেতুপুর গ্রামের মাঝিরা কি বসত করে? হোসেনের স্বপ্নপূরণের যন্ত্রাংশ ছাড়া আর কিছু কি তারা? সে মাঝিদের ভালবাসে এটা মাঝিপাড়ার কেউ বিশ্বাস করে না। পুরো উপন্যাসে একমাত্র আমিনুদ্দি একবারই বলে সাহস করে হোসেন মিয়াকে – “আমি ময়নাদ্বীপে যামুনা কইয়্যা থুইলাম।” এখন সেই আমিনুদ্দি যায় – যেতে হয়। তার মেয়ে ছাড়া আর পরিজন সবাই মারা যায় এক আকস্মিক ঝড়ে; হতাশ আমিনুদ্দি ময়নাদ্বীপে যায়; বৌ পায় – জমি পায় – আবার কুবের-এর ক্ষেত্রে দেখি-

“হোসেন মিয়া দ্বীপে আমারে নিবই কপিলা। একবার জেল খাইটা পার পামু না।”

দুই শক্তি কিভাবে পুরো উপন্যাসে হাওয়া মেলে- এক বিন্দুতে পরিণত হয়। প্রাকৃতিক শক্তি আর হোসেন মিয়া একে যেন অন্যের পরিপূরক। খেয়াল করি হোসেন মিয়া মাঝিপাড়ায় আসে কপর্দকহীন হয়ে। মাঝিপাড়ার কেউ নয় আর উপন্যাসের বয়ানে মাঝিপাড়াটাও যেন অঙ্কিত শুধুই সংকট আর সমস্যার বিপরীতে। মাঝিপাড়ার কোন ভাবসম্পদ নাই – আর এই না-থাকাটাই যেন এখানকার কালচার। কোন রকম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধও নাই। এটাও কি একটা উপনিবেশে রূপ নেয় না? যে উপনিবেশ থাকে লোক সংগ্রহের জন্য – উপনিবেশক-এর স্বপ্ন আকাঙ্খা পূরণের নিমিত্তে। আর কে না জানে পৃথিবীর ইতিহাসে ঔপনিবেশিক কাল কিভাবে তার স্বপ্ন মঞ্চস্থ করেছে। এটা হচ্ছে সেই যুগের কথা যখন ডাকাতরা হয়ে উঠতো ঐতিহাসিক – ত্রাণকর্তা। আফ্রিকার মানুষকে পাঠানো হতো আমেরিকায়। ঠিক এমনই কি ঘটে না পদ্মানদীর মাঝিতে? কেতুপুর থেকে সুদূর ময়নাদ্বীপে। উপনিবেশিতের স্বপ্ন নাই – আকাঙ্খা নাই- They are the faceless face -তাদের মুখ দাও – ভাষা দাও – এটা স্বপ্ন। মহৎ আকাঙ্খা। স্বপ্নের মায়া না থাকলে তার কাজের বৈধতাই বা কি? নতুন মানুষ হচ্ছে বৈধতার প্রধান যুক্তি। যেখানে মন্দিরও থাকবে না, আবার মসজিদও নয়। মন্দির আর মসজিদ কি একইসাথে সংস্কৃতির অংশ নয়? নতুন মানুষের সংস্কৃতি নতুনরাই নির্ধারণ করবে? কুবের রাসু আমিনুদ্দি কপিলা হবে সন্তান উৎপাদনের কারখানা আর সংস্কৃতি নির্মিত হবে হোসেন মিয়ার স্বপ্নের ভাব নির্যাস দ্বারা। তারা সভ্য হবে। ঠিক যেমন উপনিবেশকালে উপনিবেশরা উপনিবেশিতদের সভ্য করতে চাইত। নতুন মানুষতো গড়ে ওঠে পুরনো সম্পর্কের ভাঙনের মধ্য দিয়ে। আর সেটাই ঘটছে স্থানান্তরের মধ্য দিয়ে, স্বপ্ন চালানোর নামে। ওদের মতামতের কোন দাম নেই, অতএব তাদের বাধ্য কর।

হোসেন চরিত্রে আবেগ দুর্বলতা একেবারে নেই – সে ছোটবেলা থেকেই ঘুরেছে অনেক – সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। সে যত না ব্যক্তি, তার চাইতে বেশি মানব। “যন্ত্র-বিজ্ঞানে মানুষের দীক্ষা, ভৌগোলিক আবিষ্কারের অভিযাত্রা এবং সামাজিক মানব-সম্বন্ধের ক্ষেত্রে ব্যবহারিক সর্বোচ্চ স্বীকৃতি -এই তিনটি বিষয় হোসেন মিয়ার চরিত্রে চারিয়ে দিয়েছেন ঔপন্যাসিক।” [আহমদ ছফা – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি চরিত্র] আর এটা ইউরোপীয় আন্দোলনের ফলশ্রুতি। তাই ছফা হোসেন মিয়াকে নব্য মেঘনাদ বলেছেন। কিন্তু ছফা শুধু হোসেন মিয়াকেই স্বপ্ন-আকাঙ্খার মধ্য দিয়ে বিবেচনা করেছেন। রাসু কপিলা মালা আমিনুদ্দি বসির কুবেরের’র চোখের ভয় তিনি গোণায় ধরেননি। পারষ্পরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যা মূর্ততা লাভ করে তাও বিবেচনা করেননি, যা তাকে করেছে ধনী। এখন সে দাড়িতে মেহেদী লাগায়, দু’নম্বর বৌকে ঘরে এনেছে। এই আফিম স্বপ্নে কেতুপুর নিশ্চিহ্ন হবে – কুবের-আমিনুদ্দিরা হবে ‘অসভ্য আদিম কৃষক’।

তিতাস একটি নদীর নামেও ভাঙন আছে – কিন্তু তাতে জীবিকার রূপান্তর ঘটে বহিস্থ ক্ষমতাকাঠামোর চাপে। আর এ উপন্যাসে ঘটে স্থানান্তর – এক সংস্কৃতি থেকে আরেক সংস্কৃতি – এক জীবিকা থেকে আরেক জীবিকায় ফেলে দেয়া হয়। হোসেন মিয়ার স্বপ্ন – “আফিম স্বপ্ন” – কারো অংশগ্রহণ নাই – উপনিবেশিতদের আবার স্বপ্ন কি? ঠিক এসব কারণেই পদ্মানদীর মাঝিও কি “একটি বস্তু সংকেতের কল্পনামূলক রূপক কাহিনী” হয়ে ওঠে না? ইউরোপীয় আলোকপর্বের কালে বাকী পৃথিবীর সাথে যে সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল তার খতিয়ান কি আমরা পদ্মানদীর মাঝিতে পাই না?

আমি এখানে তিনটি উপন্যাস নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনটি উপন্যাসই আমাদের ঔপনিবেশিক কালপর্বের শেষদিকে রচিত হয়েছে। সময়ের হিসেবে দিবারাত্রির কাব্য বেরিয়েছিল ১৯২৮, পদ্মানদীর মাঝি ১৯৩৬, পুতুলনাচের ইতিকথা ১৯৩৬ সালে। মূলত ঐ সময়ে এই উপন্যাসগুলো তার সময়কে কিভাবে দেখেছিল বা আমাদের সময়কে কিভাবে দেখছে, আমাদের সময়েরই ঐ উপন্যাসগুলিকে কিভাবে দেখছে, এই উপন্যাসগুলি লেখককেই বা কিভাগে দেখছে সেই বোঝাপড়ার একটা প্রচেষ্টা থেকেই এই তিনটি উপন্যাস আমরা বেছে নিয়েছি। অন্য কোন লেখা নিয়েও হয়তো আলাপ আলোচনা চালানো যেত… তবে আজ এ পর্যন্তই, আপাতত!!!


ঐ যায় ঔপন্যাসিক যায়- মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর ডায়েরী থেকে নেয়া……ঘটনা ঘটেছিল ৪৬ এর দাঙ্গার পরে-যখন তিনি দাঙ্গাবিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহন করছিলেন নিয়মিত… একদিন এরকম কাজ শেষ করে যখন বাড়ী ফিরছিলেন-তখন উন্মত্ত জনতা থেকে একজন চিৎকার করে বলে- ঐ যায় ঔপন্যাসিক যায়…..
এও তো এক ধরনের পরিচয় নির্মাণ…..তাই একথাটিই বেছে নিয়েছি শিরোনামের জন্য…..
পাঠক সেলাম…


কথাসাহিত্যিক মাসিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর এই আবক্ষ ভাস্কর্যটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগিপাড়ার বনহুগলীতে। ভাস্কর্যটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত, ভাস্কর-এর নাম আমরা খুঁজে পাইনি। কেউ জেনে থাকলে আমাদেরকে জানাতে পারেন। উপকৃত হবো।

কথাসাহিত্যিক মাসিক বন্দ্যোপাধ্যায়-এর এই আবক্ষ ভাস্কর্যটি রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নিয়োগিপাড়ার বনহুগলীতে। ভাস্কর্যটি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত, ভাস্কর-এর নাম আমরা খুঁজে পাইনি। কেউ জেনে থাকলে আমাদেরকে জানাতো পারেন।

[লেখাটি সাহিত্য পত্রিকা-ওঙ্কার – মানিক জন্ম শতবর্ষ সংখ্যা, ২০০৮-এ প্রকাশিত। এই প্রবন্ধটি ২০০৮ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে সমগীত সংস্কৃতি প্রাঙ্গণের মানিক জন্মশতবর্ষ উদযাপনকালের আলোচনা অনুষ্ঠানে পাঠ করা হয়]

hasan-zafrul-bipul1
হাসান জাফরুল

গল্পকার ও চলচ্চিত্রকর্মী। ফটোক্লিক : অচিন পাঠ্য । প্রকাশিত গ্রন্থ : ইউনুস আখ্যানপর্বে স্বপ্নদোষ। শর্টফিল্ম : জুলহাস চেকার।

বিভাগ

কবিতা

error: Content is protected !!
We use cookies to personalise content and ads, to provide social media features and to analyse our traffic. We also share information about your use of our site with our social media, advertising and analytics partners. View more
Cookies settings
Accept
Privacy & Cookie policy
Privacy & Cookies policy
Cookie name Active

🍪 We Use Cookies

Our website uses cookies to improve your experience. They help us remember your preferences and analyze traffic. Some cookies are essential, while others help us optimize content. By continuing to browse, you agree to our use of cookies. You can manage cookie settings in your browser.

Save settings
Cookies settings
Scroll to Top