শূন্যম্পর্ক – শাফিনূর শাফিন
(যে চিরকুটগুলো বেনামী ভাসানো হয়েছিল সমুদ্রে)
১.
দূরের সেই লাইট হাউস থেকে নেমে আসার সময় একটা টানটান হাওয়া পিঠ টেনে ধরল। আমি দূরবীনে চোখ রেখে খুলি আঁকা পতাকার জাহাজের ডেকে দাঁড়ানো এক জলদস্যুর মুখে স্মিত হাসি দেখছিলাম। তুমি হাসছিলে কেন?
২.
ব্ল্যাকহোল গিলে খেলো ভুলে যাওয়া গতজন্মের ধূসর হয়ে আসা বিকেলের উষ্ণতা। এক মুহূর্ত আগেই সানগ্লাসে ভেসে ভেসে নেমে গেল পরিযায়ী পাখির শাদা পালক। একমুহূর্ত পরেই তুমি গন্তব্যহীন মৃত্যুকুপের দিকে যাবে বলে নোঙর তুলে নিলে। এভাবে প্রতিবার ফিরে যেতে যেতে তুমি নিঃসঙ্গ হয়ে পড় মীন রাশির হাওয়া।
৩.
প্রতিটা ঢেউয়ের তোড়ে সূর্যের পড়তি কমলা আলোয় আমাদের ছায়াগুলো মিলেমিশে হারিয়ে যায়। নতুন ছায়া দুলেদুলে জেগে উঠে।
কাল রাতে স্বপ্নে বাদামী চাবুক ঘোরাতে ঘোরাতে এক অশ্বারোহী আমার পাশ দিয়ে সাঁই করে তীব্র বেগে ছুটে আসা আলোর মতো মিলিয়ে গেল দূরের ওই নীলাভ পাহাড়ে। এই অশ্বারোহী যেন তোমারই প্রতিভাত- যে কাছে এসেও দূরে মিলিয়ে যেতেই বেশি স্বচ্ছন্দ! পাশ ফিরতেই আমার ঘুম বেণীতে বাঁধা রিবনের সাথে আলতো চমকে উঠে খুলে গেল।
এভাবে একটা নীলাভ আবছায়া কোনরাতেই আমাকে পরিপূর্ণ স্বপ্ন দেখতে দেয়না!
৪.
কোথাও কি যুদ্ধের দামামা বাজছে? অসংখ্য খুর ছুটে আসার টগবগ শব্দ? ইস্রাফিল কি নেমে আসছে শিঙায় ফুঁ দিতে দিতে?
এই ভোরে সব ঠিকানা ভুলে প্রচণ্ড বজ্রপাত এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে আমার জানলার শার্সি। নতুন একটা দিন শুরু হল তোমাকে না চিনতে পেরে। (আমি কি চিনতে চেয়েছি আসলেই? নাকি একটা ভয় এক লহমায় আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় কোন এক স্বপ্ন ভঙ্গের সৌধ নির্মাণের দিকে?)
আমি ঘুমচ্ছায়া পিছনে ফেলে উঠে দাঁড়ালাম।
৫.
পর্দা সরিয়ে দাও। সমস্ত আলো নিভিয়ে দাও – শহরের সেরা যাদুকর উঠে আসছেন মঞ্চে। এবার হবে ছায়াবাজির খেলা! টুপির ভিতরে লুকিয়ে থাকা খরগোশ হয়ে যাবে পাখি। আর তিনি কালো আলখাল্লা মেলে উড়ে যাবেন মস্ত অডিটোরিয়ামে। ঘাড়ে এসে বসে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয় এক সোনালিফড়িঙ! যাদুকর বাজপাখি নাকি মুগ্ধ ফড়িঙের বেশে খেলছেন?
তুমি ধাঁধা ভাঙতে জানো? সমুদ্রের ঢেউ, অসীম শূন্যতা, হঠাৎ ওড়ে আসা এলবাট্রস, নীলচে হয়ে নিচে নেমে আসা আকাশ – খোলা ডেকে যে অনুভবের সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়, তুমি কি সেই ধাঁধাঁর উত্তর জানো?
৬
এভাবে না পাওয়া উত্তরগুলো একটা বোতলে পুরে ভাসিয়ে দিই সমুদ্রে। কোন এক দ্বীপে গিয়ে হয়তো প্রবাল পাথরে ধাক্কা খেয়ে চুরমার উত্তরগুলো ডুবে যাবে সমুদ্রে। আর অন্যজীবন? সে তো বহতা নদীর মতন! দেখা মিলে না তাঁর সাথে জীবনের কোন মোহনায়!
নিখোঁজ হবার পথে ক’পা বাড়িয়ে থেমে আছি।
৭.
আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ি মুক চলচিত্রের মতো এই প্রাত্যহিক সব ছবি দেখে দেখে। সেই এক সূর্য ওঠা আর ডোবা। সেই একই সবুজ ঘেরা পথ। সেই একই কুকুরের লেজ নাড়ানো। অ্যাকুরিয়ামে সেই একই সোনালি মাছের মুখে বুদবুদ তুলে যাওয়া।
জীবনকে তুমি অন্ধকার থেকে ব্রাত্য করে রাখতে চাইলেই কি সে যাবে? সামনের হ্রদে হাঁসের কুৎসিত পা দেখতে দেখতে মনে হল এই কথা।
৮.
শেষজন্মের কথা ভুলে গেছি। যেমন ভুলে গেছি স্যাঁতস্যাঁতে সূর্যের নিচে হেঁটে আসা সমস্ত পথ, কোথাও ঝোপের আড়ালে আটকে থাকা একটা ডাহুকের ডাক, পানাপুকুরে ছুঁড়ে দেয়া ঢিল, নারিকেল পাতার চশমা চোখে এলাটিং বেলাটিং- এইসব ভুল রূপকথা। এরা হলুদ হয়ে যাওয়া রূপকথার বই, পড়তে পড়তে পৃষ্ঠা ছিঁড়ে ফেলেছি।
কার যেন দীর্ঘ ছায়ার উপর অনেকক্ষণ হেঁটে এলাম। ফসফরাসের মতো জ্বলছে ক্ষয়ে আসা জীবন – স্বপ্নের সার্কেল কেন এমন অপূর্ণ থেকে যায়?
৯.
বারান্দায় দাঁড়াতেই একটা মন্থর সকাল ভেসে উঠল। এখানে সবুজ ঘাসের আড়ালে কাঠবিড়ালির বদলে আজ হরিয়াল পাখির মুখ উঁকি দিয়ে পালালো। অনতি দূরে কাঁচের জানলা ভেদ করে এক নারী তাঁর পোশাক পালটালো।
মানুষের একান্ত দৃশ্য চুরি করে দেখার লজ্জায় দরজা টেনে দিলাম।

কবি। ফটোক্লিক : মৌসুমী, প্রকাশিত কবিতার বই ‘নি:সঙ্গম’
শাইলক কথা অমৃত সমান! – হাসান জাফরুল
রয়া ও নন্দিনী – নাদিয়া ইসলাম
বমি বিকার অথবা অকাল স্খলন – অমল আকাশ
ফাঁকি – আল-বিরুনী প্রমিথ