বর্ণবাদের মনস্তত্ত্বঃ বাইবেল থেকে শেক্সপীয়ার-আশফাক আহমেদ
দাসপ্রথার ইতিহাস খুব নতুন নয়। রোমান সাম্রাজ্যের সময় থেকেই এটা প্রচলিত ছিল। এক রাজ্য আরেক রাজ্যকে যুদ্ধে হারিয়ে দিলে পরাজিত রাজ্যের নারী-পুরুষকে দাস হিসেবে খাটানোর প্রথা ছিল। গায়ের রঙের সাথে এর কোনরকম সংযোগ ছিল না তখন।
দাসপ্রথার সাথে বর্ণবাদের সংযোগ ঘটে মধ্যযুগে। ইউরোপ তখন আফ্রিকা দখল করে নিচ্ছে। এশিয়ায় অভিযান চালাচ্ছে। আমেরিকা নামে একটা নতুন মহাদেশও আবিষ্কার করেছে। ইউরোপের লোভ আর দুরন্ত শক্তিমত্তার কাছে গোটা দুনিয়া তখন অসহায়।
উপনিবেশ থেকে পাওয়া স্বর্ণ আর সম্পদে ইউরোপীয়দের অর্থনীতি ফুলে ফেঁপে উঠছে। এই অর্থনীতির জোয়াল কাঁধে নেবার জন্য তাদের প্রয়োজন ছিল শ্রমিকের। সস্তা শ্রমিকের।
আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানরা এই শ্রমের যোগান দিতে পারছিল না। রেড ইন্ডিয়ানরা ছিল অতিমাত্রায় স্বাধীনচেতা। কোন রকম ভয়ভীতি দেখিয়ে বা ধর্মীয় গ্রন্থের দোহাই দিয়ে তাদের বশে আনা যায়নি। ফলশ্রুতিতে কখনো ছলেবলেকৌশলে, কখনো বা কোনরকম ভণিতা ছাড়াই অসম যুদ্ধে তাদের লিটার্যালী মেরে ফেলতে হয়েছে। গণহারে তাদের দাস হিসেবে খাটানো সম্ভব হয়নি যেটা করা গেছে আফ্রিকার দাসদের সাথে।
জাহাজ বোঝাই করে দলে দলে দাস আমদানি করা হয়েছে ইউরোপ আর আমেরিকায়। কালোদের ন্যূনতম মানবিক অধিকারকে অস্বীকার করে তাদের খাটানো হয়েছে অমানুষিক পরিশ্রমের সব কাজে। ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যাণ্ডের মত প্রভাবশালী সব ব্যাঙ্কের জন্মই এই দাস ব্যবসাকে কেন্দ্র করে।
অথচ ইউরোপে তখন কিন্তু রেনেসাঁস শুরু হয়ে গেছে। মানুষে মানুষে সাম্য, মৈত্রী আর স্বাধীনতার বার্তা প্রবাহিত হচ্ছে দিকে দিকে। এমন একটা সময়েও ওরা কীভাবে পারলো কালোদের এরকম মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করতে?
একটা ব্যাখ্যা তো মাত্রই দিলাম। অর্থবীতির চাহিদা আর যোগানের খেল। আরেকটা ব্যাখ্যা বলে, ইউরোপীয়রা যখন প্রথম আফ্রিকার কালো মানুষের সাক্ষাৎ পায়, তখন এই মানুষগুলো সত্যিই মানুষ তথা হোমো সেপিয়েন্স প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত কিনা—এই নিয়ে তারা সংশয়ে পড়ে যায়। এই সংশয় কিন্তু তাদের ভারতীয় বা চাইনিজদের নিয়ে ছিল না। কাজেই, মানুষ যে ন্যূনতম অধিকার নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়—কালোদের ক্ষেত্রে তা পূরণ করার বাধ্যবাধকতা নিয়ে তাদের মনে কোন নৈতিক দায়বদ্ধতা ছিল না।
বাইবেল ঘেঁটে ধর্মগুরুরা এই নৈতিক দায়বোধ থেকে তাদের মুক্তি দেন।
বাইবেলের গল্পটা বলি।
নূহের তিন ছেলে। হ্যাম ,শ্যাম আর জাপতেথ।
অতিরিক্ত মদ্যপানের ফলে নূহ একদিন বেসামাল হয়ে যান। জামাকাপড় খুলে নিজ তাঁবুতে ঘুমিয়ে পড়েন।
ছেলে হ্যাম এসে বাপকে নগ্ন অবস্থায় দেখে ফেলে। সঙ্গে সঙ্গে অন্য দুই ভাইকে ডেকে আনে সে।
দুই ভাই মিলে বাপকে কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয়। ঢেকে দেবার সময় তাদের মুখ ছিল উলটো দিকে ঘোরানো। যেন বাপের নগ্ন অবস্থা তাদের দেখা না লাগে।
ঘুম থেকে উঠে নূহ পুরো ঘটনার ব্ত্তান্ত শুনলেন। তিনি হ্যামকে অভিশাপ দিলেন, হ্যামের বংশধররা যুগ যুগ ধরে অন্য দুই ভাই’র বংশধরদের দাসব্ত্তি করবে।
হ্যামের সন্তান ক্যানান। ক্যানানের বংশধরদের বলা হয় ক্যানানাইট। এই ক্যানানাইটদের পরবর্তীতে ইসরায়েলীরা দাসব্ত্তিতে বাধ্য করেছিল। আর এই ব্যাপারটাকে জাস্টিফাই করেছিল বাইবেলের এই ঘটনা দিয়ে।
বাইবেলের কোন গল্পই অবশ্য বিতর্কের ঊর্ধে না। ইহুদী রাব্বীরা এর এক রকমের ব্যাখা দেয়, খ্রিস্টান ফাদাররা আরেক রকমের। আর ইসলামে সম্ভবত এরকম কোন ঘটনার উল্লেখ নেই।
তবে এই ঘটনা সবচেয়ে বেশি পারপাস সার্ভ করেছে ইউরোপীয় শেতাঙ্গদের। তারা যখন জাহাজ বোঝাই করে কালোদের এনে দাস হিসেবে নিয়োজিত করতো, তখন বাইবেলের এই ঘটনাকে জাস্টিফিকেশন হিসেবে খাড়া করাতো।
চার্চ ফাদাররা তখন এই ঘটনার নতুন ইন্টারপ্রিটেশন দাঁড় করান। ব্যাখ্যাটা এরকম—এই দুর্মূখ কালোরাই হচ্ছে সেই হ্যামের প্রক্ত বংশধর। আর আমরা হচ্ছি নূহের দুই ভালো ছেলের বংশধর। আর বাইবেলে বলাই আছে, এদের দাস হিসেবে খাটাতে। কাজেই, দাস ব্যবসা নৈতিক ও ধর্মীয় বৈধতা পেয়ে যায় এখান থেকে।
সেকালে শেক্সপীয়ারের নাটকেও আমরা এই বর্ণবাদের দেখা পাই। শাদা প্রসপেরো সেখানে কালো ক্যালিবানকে বলছেঃ It wouldn’t be such a ghetto if you took the trouble to clean.বোঝাতে চাচ্ছে, কালো মানেই অলস আর নোংরা। এতোটাই নোংরা, যে নিজের শোবার ঘরটা পরিষ্কার করার সময়ও তার হয়ে ওঠে না।
কালোদের সম্পর্কে এটা সমাজের গড়ে ওঠা এক স্টেরিওটাইপ ধারণা। সমাজ এটা মনে রাখে না, তারা যে সুসজ্জিত ইমারতে বসবাস করছে, তার পেছনে আছে নোংরা বসত-বাড়িতে বসবাসরত এই কালোদের শ্রম। পুঁজিবাদ কখনোই চায় না, তার শ্রমিকদের জীবনের কোনরকম মান উন্নয়ন হোক। কালোদের জন্য তাই সে বরাদ্দই করেছে ঐ নোংরা ঘেটো। যেখানে কালোরা দিনরাত পরিশ্রম করে এসে কেবল মরার মত ঘুমোবে। নিজের আবাসকে সুন্দর করার জন্য, স্নিগ্ধ করার জন্য এক মুঠো সময়ও সে পাবে না।
অলস, শ্রমবিমুখ যদি কাউকে বলতেই হয়—তবে ঐ শাদারা। মানুষের স্বভাবই হচ্ছে, যে সে নিজের ত্রুটি কখনো নিজে দেখতে পায় না। দিনরাত শাদাদের বাড়িঘর আর ক্ষেতখামারে কাজ করা কালোদেরই তাই নোংরা থাকার দায় নিয়ে বেঁচে থাকতে হয়।
এমনকি প্রসপেরো সন্দেহ করেন যে, কালো ক্যালিবান তার মেয়েক ধর্ষণ চেষ্টায় লিপ্ত আছে। এটাও শ্বেতাঙ্গদের স্টেরিওটাইপ ধারণারই প্রকাশ। শ্বেতাঙ্গ পুরুষ মাত্রেরই ধারণা, কালোরা তাদের সতী-সাধ্বী নারীদের নষ্ট করে দিচ্ছে। ইতিহাস কিন্তু বলে উলটোটাই ঘটেছে বেশি। যতোজন না কালো পুরুষ শ্বেতাঙ্গ নারীর সাথে সম্পর্ক তৈরি করেছেন, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি শ্বেতাঙ্গ পুরুষ কালো নারীদের ইচ্ছেমত ভোগ করেছেন। এর মধ্যে অনেকেই সমাজে যথেষ্ট ধার্মিক ও অনুসরণীয় হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
শেক্সপীয়ার তার নাটকে ক্যালিবানের কোন ভয়েস রাখেননি। কালোদের কী ভাবনা—জনপ্রিয় নাট্যকারদের বয়ান থেকে সেটা তাই আমাদের জানার সুযোগ হয় না।
শেক্সপীয়ারের টার্গেট কনজিউমার ছিলেন শ্বেতাঙ্গ নারী-পুরুষ। তিনি তাদের মনোরঞ্জনের জন্যই ক্যালিবানকে চিত্রায়িত করেছেন। নোংরা ক্যালিবান। অলস ক্যালিবান। লম্পট ক্যালিবান।
সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বর্ণবাদের যে প্রবাহ বইছিল, মহান সাহিত্যিকও তা থেকে ঠিক মুক্ত নন।
বর্ণবাদের শক্তিটা এইখানেই। কখন যে এটা আমাদের রক্তের মধ্যে মিশে যায়, আমরা টেরও পাই না। আপাত নির্দোষ ভাবনাতেও তখন সে শক্ত ঠাঁই গেড়ে বসে। শত বছরের চেষ্টাতেও সেই শেকড় পুরোপুরি ওপড়ানো যায় না।

ফটোক্লিক: এস.কে.রাসেল
শাইলক কথা অমৃত সমান! – হাসান জাফরুল
রয়া ও নন্দিনী – নাদিয়া ইসলাম
বমি বিকার অথবা অকাল স্খলন – অমল আকাশ
ফাঁকি – আল-বিরুনী প্রমিথ