ওঙ্কার

পদ্মার ঢেউয়ে ঢেউয়ে – ফিরোজ আহমেদ

Post Views14 Total Count
0Shares
ফিরোজ আহমেদ

এক.

প্রথমেই জানাই-

ইতিহাসগ্রন্থে ধরে নেয়া হয়েছে যে, পদ্মা নামের গঙ্গার শাখাটি নতুন। এর আদিশাখা ভাগীরথী। যেমন: ‘একসময়ে গঙ্গার জলস্রোত একমাত্র ভাগীরথী দিয়েই প্রবাহিত হত; পরে এই জলরাশি পদ্মা দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ভাগীরথী ক্ষুদ্রকায়া নদীতে পরিণত হল। … পবিত্র গঙ্গানদীর বেশীর ভাগ জল এখন পদ্মাগর্ভ বহন করছে; তাই পদ্মা এখন একটি মহানদী। তবু কিন্তু গঙ্গাজলের পবিত্রতা এই ভাগীরথী বা হুগলী নদীর জলে বর্তমান; পদ্মার জলে তা নেই। দূর দূর থেকে পুণ্যার্থীরা এই ক্ষুদ্র নদীগর্ভেই স্নান করতে আসে।’ (ড. দীনেশচন্দ্র সরকার, পাল-পূর্ব যুগের বংশানুচরিত)

গঙ্গার মাহাত্ম্যের তুলনীয় আর কিছুই নয়। শরশয্যায় পিতৃব্য ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে বলছেন, ‘সেই দেশ জনপদ ও আশ্রমই শ্রেষ্ঠ যার মধ্যদিয়ে সরিদ্বরা গঙ্গা প্রবাহিত হন। তপস্যা, ব্রহ্মচর্য ও দানের যে ফল, গঙ্গার আরাধনাতেও সেই ফল। যারা প্রথম বয়েসে পাপকর্ম করে পরে গঙ্গার সেবার করে, তারাও উত্তম গতি পায়। হংসাদি বহুবিধ বিহঙ্গে সমাকীর্ণ গোষ্ঠ সমাকীর্ণ গঙ্গাকে দেখলে লোকে স্বর্গ বিস্মৃত হয়। গঙ্গাদর্শন গঙ্গাজলস্পর্শ ও গঙ্গা অবগাহন করলে উর্ধ্বতন ও অধস্তন সাত পুরুষের সদগতি হয়’ (বঙ্গানুবাদ রাজশেখর বসু)। কিন্তু একই নদীর শাখা হয়েও, জন্মাবধি গঙ্গামাতার অধিকাংশ জল বহন করে আসা পদ্মা গঙ্গার সেই মাহাত্ম্যের ভাগ পায়নি মোটে, আর বর্তমানে ফারাক্কায় বাঁধের কল্যাণে তার প্রাণও প্রায় যায় যায়।

দুই.

চর্যাপদকে পণ্ডিতেরা বাংলা, ওড়িয়া, অহমিয়া, মৈথিলী প্রভৃতি ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন বলে সাব্যস্ত করেছেন। চর্যাপদের কাল যদি দশম থেকে দ্বাদশ শতকের মাঝে কিংবা তারও আগেকার হয়, তবে পদ্মার প্রথম উল্লেখটিও চর্যাপদেই। কেবল ঝামেলা একটাই, চর্যাপদে পদ্মানদীর উল্লেখ আছে একটা ‘ খাল’ হিসেবে:

বাজ ণাব পাড়ী পঁউআ খালেঁ বাহিউ। অদঅ বংগালে দেশ লুড়িউ।। আজি ভুসুক বঙ্গালী ভইলী। নিঅ ঘরিণী চণ্ডালী লেলী।

নীল রতন সেনের পাঠ ও অনুবাদে আধুনিক বাঙলায় এর অর্থ:

বজ্রনৌকা পেড়ে পদ্মাখালে বাওয়া হল/ অদ্বয় বাঙ্গালের দ্বারা দেশ লুঠ হল।।/ আজ ভুসুকু বাঙ্গালী হল।/ নিজ ঘরনী (রূপে) চণ্ডালীকে নিল।।

এই উল্লেখে দু’টি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এক, চর্যাপদে গঙ্গা, যমুনা প্রভৃতি উত্তর ভারতের পরিচিত নদীগুলোকে ‘নদী’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে; যেমন চৌদ্দ ক্রমিক সংখ্যার চর্যাগীতিটির প্রথম চারটি পঙক্তি:

গঙ্গা জঊণা মাঝে রে বহই নাই/ তহিঁ চুড়িলী মাতঙ্গি লীলে পার করেই/ বাহ তু ডোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উয়ারা।/ সৎগুরু পাঅপএঁ জাইব পুনু জিণউরা।। (নীল রতন সেন কৃত আধুনিক বাঙলায় অর্থ: গঙ্গা-যমুনার মাঝেরে বয়ে চলে নৌকা/ তাতে চড়লে মাতঙ্গী-পুত্রী লীলায় পার করে/ বেয়ে চল্ তুই ডোম্বী, বেয়ে চল্ ওলো ডোম্বী, পথে বেলায় হল/ সদ্গুরু-পাদপ্রসাদে যাব পুনর্বার জিনপুর।)

কেবল সদৃশ জলপথ হিসেবে মোটা দাগে নদী আর খালকে গুলিয়ে ফেলার সম্ভাবনা এখানে খুবই কম। টীকাতে আবার বলা হয়েছে বজ্রনৌকা পদ্মযানে চালানো বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেহ-সাধনায় যৌনমিলনকেই রূপকায়িত করেছে। গঙ্গা-যমুনার যে উল্লেখটি আমরা পেলাম, সেটিও কিন্তু রূপকার্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে যোনিচিহ্ন হিসেবে পদ্মখাল ব্যবহার করা হলেও বাস্তব একটি জলপ্রবাহ হিসেবে এর অস্তিত্ব সম্পর্কে লেখকের সচেতনতাও খুবই সম্ভব। জটিলতাটি কেবল একে খাল বলে উল্লেখ করাতে। দ্বিতীয়ত, এই প্রথম সাহিত্যে আমরা ‘বাঙালি’ ভুক্তিটিও পেলাম; বঙ্গ, বঙ্গপতি ইত্যাদি রাষ্ট্রনৈতিক উল্লেখ এর আগে থাকলেও আমাদের পাওয়া এই প্রথম কেউ নিজেকে সংস্কৃতিগতভাবে বাঙালি বলে চিহ্নিত করছে। পদ্মা আর বাঙালি ভুক্তিটি একই কাব্যে একসাথে প্রথমে পাওয়াটা বড় কম কথা নয়।

তিন.

দীনেশচন্দ্র সরকার তাঁর পালপূর্ব যুগের বংশানুচরিত নামের গ্রন্থটিতে প্রাচীন বাঙলার ইতিহাস আলোচনায় সঙ্গত কারণেই পদ্মার প্রবাহ পরিবর্তনের উল্লেখ অনেকবার করতে বাধ্য হয়েছেন, আধুনিক কালের পদ্মার প্রবাহ বিষয়ে তার একটি উল্লেখ থেকে পাঠকেরা পদ্মার প্রাচীন ও হাল আমলের নড়াচড়া সম্পর্কে একটা ধারণা পাবেন: ‘ফরিদপুর জেলার ইদিলপুরে প্রাপ্ত দশম শতাব্দীর চন্দ্রবংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের শাসনে পদ্মা (পদ্মাবতী?) নদীর সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন এ অঞ্চলে পদ্মানামের যে ক্ষুদ্র নদী প্রবাহিতা ছিল, পরে গঙ্গার পূর্বশাখার জলস্রোত তার খাতে পড়ার ফলে সেটি ক্রমে সুবৃহৎ নদীতে পরিণত হয়ে পদ্মা নাম পায় বলে মনে হয়… বিগত কয়েক শতাব্দীতে পদ্মা নদীর বহু বিবর্তন ঘটেছে। পন্ডিতেরা মনে করেন পদ্মা এক সময় রামপুর বোয়ালিয়ার কাছ দিয়ে চলন বিলের পথে ধলেশ্বরী ও বুড়িগঙ্গার খাতে ঢাকা পেরিয়ে মেঘনার নিম্নভাগে পড়ত; কিন্তু অষ্টাদশ শতকে নদীটি ফরিদপুর ও বাখরগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে এসে দক্ষিণ শাহাবাজপুর দ্বীপের উপর দিকে কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত চাঁদপুরের প্রায় বিশ মাইল দক্ষিণে মেঘনার মোহনায় মিলিত হয়। মুর্শিদাবাদের নবাবগণের সভাসদ রাজা রাজবল্লভের নির্মিত রাজনগর এক সময় পদ্মার বামতীরে অবস্থিত ছিল এবং নিকটবর্তী কালীগঙ্গা নদী পদ্মা ও মেঘনাকে সংয্ক্তু করত। রাজনগর প্রভৃতি বহুজনের কীর্তি পদ্মাগর্ভে বিলীন হওয়ায় এখানে নদীর নাম হয় কীর্তিনাশা।’

এর পরপরই পাওয়া যাচ্ছে একটি চমকপ্রদ তথ্য, ‘বর্তমানে ঢাকা জেলার মুন্সীগঞ্জ মহকুমায় বিক্রমপুর পরগনা অবস্থিত এবং ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমা দক্ষিণ বিক্রমপুর নামে পরিচিত, এই দুই জেলার মধ্যে বিস্তৃত পদ্মানদী; কিন্তু এক সময়ে এই দু’টি অঞ্চল জুড়ে অখণ্ড বিক্রমপুর নামের জনপদ বিস্তৃত ছিল, পরে পদ্মা এসে তাকে দ্বিখণ্ডিত করে। সেনরাজবংশের লেখাবলীতে দেখা যায়, ফরিদপুর জেলার কোটালীপাড়া ও ইদিলপুর পরগনা বিক্রমপুরের অন্তর্গত ছিল।’

দীনেশচন্দ্র সরকার গঙ্গার শাখা হিসেবে পদ্মার উদ্ভব ঘটার সম্ভাব্য কালও একটা নির্ধারণ করেছেন ‘ষোড়শ শতকের পূর্বে গঙ্গানদী গৌড়-নগরের উত্তর ও পূর্ব দিয়ে প্রবাহিত হত এবং সে সময়ে ঐখান থেকেই গঙ্গার পূর্ব-দক্ষিণ বাহিনী পদ্মা শাখার উদ্ভব হয়। অবশ্য ষোড়শ শতাব্দী থেকে গঙ্গার ভাগীরথী ও পদ্মারূপে দ্বিখণ্ডিতভাব গৌড়নগরের অনেকটা দক্ষিণদিকে ঘটেছে।’ এর আগে উল্লেখিত পদ্মাবতীকে কেন গঙ্গার স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন অনুমান করেছেন, সেটি গ্রন্থকার উল্লেখ করেননি। তবে পদ্মাবতীর ক্ষীণকায়া হবার সম্ভাবনা যথেষ্ট, প্রচুর পলির আগমন নিয়মিতভাবেই এর শাখাগুলোকে মজিয়ে ফেলত। বইটির শুদ্ধি সংযোজন অংশে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তি আমরা পাই, যেটি যথেষ্টই কৌতুহলোদ্দীপক। ‘আমরা দেখেছি আদি-মধ্যযুগে গঙ্গার পূর্বশাখা অর্থাৎ পদ্মানদীর উদ্ভব হয়নি। এমনকি মধ্যযুগেও কোন সময় করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র একযোগে সমুদ্রে পড়ত বলে বোধ হয়। তাই দেখতে পাই প্রাচীন যুগে কামরূপের রাজগণ সৈন্যসামন্ত হাতিঘোড়া নৌকায় চাপিয়ে ব্রহ্মপুত্র দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়তেন এবং গঙ্গা বেয়ে বিহারের দিকে চলে যেতেন। ভাস্করবর্মা ২০,০০০ হাজার হস্তী ৩০,০০০ নৌকায় চড়িয়ে ঐরূপে হর্ষবর্ধনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন।’

এই সাক্ষাতটি যখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন ভাস্করবর্মা আর হর্ষবর্ধন উভয়ের সাধারণ শত্রু শশাঙ্কর গৌড়ের পতন ঘটেছে। তারপরও অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের স্থল পথ বাদ দিয়ে এই সমুদ্রপথ অবলম্বন ভাবনার উদ্রেক করে। পদ্মা অস্তিত্বহীন কিংবা গঙ্গাবিযুক্ত থাকলে এবং পদ্মার স্রোত-ধারায় গঙ্গানদীটি আসামগামী ব্রহ্মপুত্রের সাথে যুক্ত না থাকলে এবং স্থলপথে যাতায়াত দারুণ অগম্য হলেই কেবল কামরূপের রাজার পক্ষে শালজঙ্গলাকীর্ণ পথ পাড়ি দেয়ার চাইতে প্রাগজ্যোতিষপুর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদী পথে নেমে বঙ্গোপসাগর ধরে এগিয়ে গঙ্গার ভাটিতে আবারও ওপরের দিকে উঠে বিহার যাওয়াটা স্বাভাবিক হয়।

এমনকি যদি পদ্মা ইতিমধ্যেই গঙ্গার সাথে মিশে গিয়ে থাকেও, তারপরও দুর্গম ও জনবসতির ঘাটতি আছে এমন নদীপথের (পদ্মা) চাইতে ব্রহ্মপুত্র বেয়ে সমুদ্র পথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয়াও সুবিধাজনক হতে পারত। কিংবা আর একটি সুবিধাজনক ব্যাখ্যা হলো প্রচুর পলিবহন করার কারণে পদ্মার ঘন ঘন খাত বদল, পুরাতন খাতগুলো এর ফলে প্রায়ই ব্যবহার অযোগ্য হয়ে পড়ত। এর সাথে যুক্ত হতে পারে স্থলপথের অগম্যতা ও শত্রুভাবাপন্ন জাতির বাস। এত অজস্র সম্ভাবনার কারণে ধাঁধাটির সমাধানসূত্র সুনিশ্চিত নয়।

১৭৭৭-এর রেনেলের মানচিত্রে বিহার এবং বেঙ্গল। Dury wall map of Delhi and Agra 1777 প্রাপ্তিসূত্র: wikipedia.

১৭৭৭-এর রেনেলের মানচিত্রে দিল্লী এবং আগ্রা। Dury wall map of Delhi and Agra 1777 প্রাপ্তিসূত্র: wikipedia.

১৭৭৬-এর রেনেলের মানচিত্রে বিহার এবং বেঙ্গল। Dury wall Map of Bihar and Bengal 1776 প্রাপ্তিসূত্র: wikipedia

১৭৭৬-এর রেনেলের মানচিত্রে বিহার এবং বেঙ্গল। Dury wall Map of Bihar and Bengal 1776 প্রাপ্তিসূত্র: wikipedia

‘মধ্যযুগেও কোন সময় করতোয়া ও ব্রহ্মপুত্র একযোগে সমুদ্রে পড়ত’ বলে দীনেশচন্দ্র মনে করলেও ১৭৬৪-৭৭ সালে প্রস্তুতকৃত রেনেলের মানচিত্রে কিন্তু আমরা করতোয়াকে গঙ্গায় মিলিত দেখি, ব্রহ্মপুত্রে না। বর্তমানে করতোয়া ব্রহ্মপুত্রে মিলিত, এর অনতিকাল পরই তা আবার ব্রহ্মপুত্র মিলিত হয়েছে পদ্মার সাথে। তারমানে দীনেশচন্দ্রর বক্তব্য সঠিক হলে করতোয়া প্রাচীন কালে ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলিত হলেও কোন একসময় তা রেনেলের মানচিত্র প্রস্তুতির আগেই মিলিত হয়েছে পদ্মার সাথে, এবং ১৭৮৭ সালের মহাবন্যার পরবর্তীতে বর্তমানে আবার ব্রহ্মপুত্রের সাথে। করতোয়ার স্রোতের উৎস তিস্তা নদী স্বয়ং ১৭৮৭ সালের মহাবন্যার পর গতি বদলে দক্ষিণপুবে সরে আসে এবং ব্রহ্মপুত্রের সাথে মিলে যায়, করতোয়াসহ এর শাখা নদীগুলো তাদের স্রোত হারিয়ে পরিণত হয় গৌণ স্রোতে ।

১৭৮৭ সালে মহাপ্লাবন ব্রহ্মপুত্রর ইতিহাসেও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বন্যায় নদীটি দু’টি শাখায় বিভক্ত হয়, একটি শাখা তিস্তার সাথে যমুনাতে মিলিত হয়। আরেকটি শাখা পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নামে পূর্বের খাতেই বহমান। যমুনা খাতেই ব্রহ্মপুত্রের অধিকাংশ জল নিষ্কাষিত হয়, যদিও একসময় পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ছিল প্রবল একটি নদী। যমুনাও এরপরই মিলিত হয় পদ্মার সাথে। করতোয়া আর ব্রহ্মপুত্র উভয়েই পবিত্র নদী, মহাভারতে ব্রহ্মপুত্রকে বর্ণনা করা হয়েছে লৌহিত্য বলে, আর করতোয়া স্বয়ং মহাদেব শিবের হাতের স্পর্শে পবিত্র হয়েছে। প্রথমটি পুণ্ড্রর আর পরেরটি প্রাগজ্যোতিষপুর সভ্যতার জলদায়ী। মহাভারতে উভয়ের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে খাঁটি ক্ষত্রিয় হিসেবে, যদিও আমরা দেখব এই ক্ষত্রিয়করণ আসলে ‘বৈদিকীকরণ’ বা ‘আর্যীকরণ’ প্রক্রিয়ার সাথে সম্পর্কিত, এর অর্থ কোন ভাবেই জাতিগুলোর নৃতাত্ত্বিক আর্যত্বের সম্ভাবনা নয়। করতোয়া কামরূপ আর পুণ্ড্রর একটা সাধারণ সীমাও বটে, যদিও তা লঙ্ঘিত হয়েছে বহুবার।

এই সব বর্ণনায় প্রাচীন আমলে পদ্মার গঙ্গা থেকে বিচ্ছিন্ন চর্যাপদ কথিত একটি খাল বা দীনেশচন্দ্র সরকার কতিত একটি ক্ষুদ্র নদী হিসেবেই পদ্মার অস্তিত্বটি একটা সম্ভাবনা হিসেবে কিছুটা ঐতিহাসিকতা পায়। পদ্মার সাথে প্রাচীনত্ব বিষয়ক প্রতিযোগিতা ভাগীরথীর। পদ্মা যদি আদিতে গঙ্গার সাথে যুক্ত না থাকে, তবে ভাগীরথীই প্রাচীনতর নদী। সেই অধিকারে মাহাত্ম্য যা কিছু তার একারই পাওনা।

বাঙালির আরেক ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন রায়ও ভাগীরথীকেই গঙ্গার আদি শাখা বলে মনে করেন, তার বাঙালীর ইতিহাস: আদিপর্ব গ্রন্থে তিনি এমনকি উইলকক্স-এর ভাগীরথী নদীটি ভগীরথ কর্তৃক খনিত হবার সম্ভাবনাটিকেও অনৈতিহাসিক বলে মন্তব্য করেছে। তবে তার সাক্ষ্য ইতিহাস নয়, পুরাণ গ্রন্থই: ‘রাজমহল-গঙ্গাসাগর প্রবাহই যে যথার্থত ভাগীরথী ইহাই রামায়ন-মহাভারত-পুরাণের ইঙ্গিত, এবং এই প্রবাহের সঙ্গেই সুদূর অতীতের সূর্যবংশীয় ভগীরথ রাজার স্মৃতি বিজড়িত।’ তবে নীহাররঞ্জন পদ্মার যে বয়স নির্ধারণ করেছেন, তা পরবর্তীকালের ইউরোপীয় পর্যটকদের চেয়ে অধিক বয়েসী। এই বিষয়ে একই মত কপিল ভট্টাচার্যেরও, নানান ঐতিহাসিক তথ্য থেকে তাদের অনুমান পদ্মা এমনকি আরও উপরের পথ দিয়ে চলন বিল, বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী ইত্যাদিকেও জড়িয়ে প্রবাহিত হয়েছে আরেকটি কালে; বুড়িগঙ্গা, ধলেশ্বরী তখন পদ্মারই প্রবাহ ছিল, বর্তমানে তা পুরাতন ব্রহ্মপুত্রের খাতে প্রবাহিত।

চার.

এবার তাই আমাদের নদী বিশেষজ্ঞদের দ্বারস্থ না হয়ে উপায় থাকে না। খ্যাতিমান ভারতীয় নদীপ্রকৌশলী কপিল ভট্টাচার্য সেচপ্রকৌশলী উইলিয়াম উইলকক্সের সাথে একমত পোষণ করে মনে করেন, গঙ্গার আদি খাত পদ্মাই। ভাগিরথী তার মতে গঙ্গা-পদ্মা থেকে কেটে আনা খাল ছাড়া আর কিছুই না। কপিল ভট্টাচার্য থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক: ‘বাংলাদেশের মানুষের মনের সংস্কার কিন্তু ভাগীরথীকেই গঙ্গার প্রধান প্রবাহ খাত বলে মনে করে। হিন্দু সভ্যতায় গঙ্গা মাহাত্ম্যের প্রচারণা এই ভাগীরথীকেই গঙ্গা বলে প্রচার করেছে। উইলকক্স সাহেবের পরবর্তী বহু ঐতিহাসিক ও ইঞ্জিনিয়ারেরাও ১৯২৮ খৃস্টাব্দের পর বলতে চেয়েছেন, ভাগীরথীই গঙ্গার প্রথম মুখ্য খাত… কিন্ত ভূতাত্ত্বিকদের গবেষণা ভাগীরথীর গঙ্গার প্রধান খাত হওয়া সম্বন্ধে সন্দেহ আনে। তারা বলেন, ভাগীরথী-হুগলীর নিম্নাংশ প্রথম থেকেই সমুদ্রের খাঁড়ি ছিল। উত্তর-পশ্চিম প্রদেশে ও বিহারের গাঙ্গেয় উপত্যকায় এবং পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক গাঙ্গেয় পলিস্তরের নিচে যে হরিদ্রাভ লাল কংকর প্রস্তর মিশ্রিত মৃত্তিকার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে, তা থেকে প্রতীয়মান হয়, হিমালয় পর্বত থেকে আজকের এই বিপুলায়তন গঙ্গা সম্পূর্ণ অবতরণ করবার আগে এখানকার সাগরগর্ভ মধ্যপ্রদেশ ও ছোটনাগপুরের পার্বত্য উপত্যকায় উৎপন্ন প্রাচীন বিশালায়তন নদীর জলধারায় বাহিত পলির দ্বারাই পূর্ণ হয়েছিল। দামোদর প্রভৃতি প্রাচীন সংস্করণ নদ-নদীর পলি দিয়েই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান ভাগীরথী উপত্যকার নিম্নতম স্তর গঠিত। সুতরাং গঙ্গা অবতীর্ণ হয়ে প্রথমেই বর্তমান পদ্মার প্রবাহপথে প্রবাহিত হত, অথবা ভাগীরথীর পথে প্রবাহিত হত, সে সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে গেলে সমস্ত গঙ্গা-পদ্মা ও ভাগীরথীর খাতে গভীর নল পুতে ওই হরিদ্রাভ লাল মাটির ঢাল (slope) পরীক্ষা করতে হবে।’

‘পদ্মাকে গঙ্গার প্রধান খাত হিসেবে মেনে নিতে বৈজ্ঞানিক কোন অসুবিধাই হয় না’ এই মতে দৃঢ় থেকে কপিল ভট্টাচার্য ভৌগোলিক ঢালের গঠনগত কারণও স্পষ্ট করেন: ‘বাংলা দেশের গঙ্গার ব-দ্বীপের উচ্চাবচকতা নিদর্শক মানচিত্র (রিলিফ ম্যাপ) দেখলে বোঝা যায়, গঙ্গা থেকে ভাগীরথীর উৎপত্তি স্থানটিই সর্বোচ্চ, এবং ভাগীরথী অপেক্ষাকৃত উচ্চভূমি দিয়েই প্রবাহিত হচ্ছে, এর পূর্বদিকস্থ নিম্নাঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়নি। ভগবানগোলা থেকে সুন্দরবনের বিদ্যাধরী নদীর মোহনা পর্যন্ত যদি একটি সরল রেখা টানা যায়, তা হলে এই সরল রেখার পশ্চিমের ভূভাগ ক্রমশঃ পশ্চিম দিকে উঁচু হয়ে ছোটনাগপুরের মালভূমিতে মিশেছে। আর ওই সরল রেখা থেকে পূর্বে ভূভাগ ক্রমশঃ ঢালু হয়ে গিয়েছে মধ্যবঙ্গে। ফরিদপুর, বরিশাল, খুলনা প্রভৃতি জেলা নিম্নতম ভূমিতে অধিষ্ঠিত, তারপর ভূমি আবার পদ্মা-মেঘনার পূর্বপারে ক্রমশঃ উচু হয়ে ত্রিপুরা-চট্টগ্রামের পর্বতে উঠেছে। গঙ্গা-পদ্মার স্বাভাবিক প্রবাহ যে নিম্নের দিকেই, বর্তমান খাতের কাছাকাছি পথ অবলম্বন করে গিয়েছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ করবার কারণ কি?’

উইলকক্স-এর সাথে অবশ্য কপিল ভট্টাচার্য একটি বিষয়ে গুরুতর ভিন্নমত জানান, সেটি ভাগীরথী খননের উদ্দেশ্য বিষয়ক। উইলককস এর মতে ভাগীরথী খনন হয়েছিল সেচের উদ্দেশ্যে, কপিল ভট্টাচার্য তা অসম্ভব মনে করেন। পৌরাণিক সাহিত্যে বৃষ্টির আশায় যজ্ঞাদির কথা বলা থাকলেও সেচকার্যের জন্য খালের উল্লেখ কোথাও নেই; আল, বাঁধ প্রভৃতির উল্লেখ আছে বৃষ্টির জল কৃষিভূমিতে ব্যবহার উপলক্ষে। এবং সে যুগের জনসংখ্যার ঘনত্ব, ধান চাষের ধরণ প্রভৃতির বিবেচনায় এই যুক্তি কিছুটা গ্রহণযোগ্যও বটে। নদীখননের পেছনে সেচ কার্যের বিকল্প কারণ হিসেবে কপিল বরং অনুমান করেন ‘ভাগীরথী নদী খননের প্রধান কারণ ছিল গঙ্গা নদীর নাব্যতা রক্ষা করা। ভগীরথ ভাগীরথী খালটি গঙ্গার ধারা থেকে কেটে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ছোটনাগপুরের উপত্যকায় উৎপন্ন নদীর ইতোমধ্যেই মজাখাতগুলি অবলম্বন করে সমুদ্রের খাড়ির সঙ্গে সংযুক্ত করে দিয়েছিলেন সমুদ্র যাত্রাপথের দীর্ঘতা হ্রাস করার জন্য। পূর্ববঙ্গের সমতটভূমি দুর্ধর্ষ অনার্যদের বাসভূমি ছিল, আর্য রাজারা ওই দেশ পরিহার করেই চলতেন। বর্তমান চব্বিশ পরগণা, হাওড়া ও মেদিনীপুর জেলা কপিলের রাজ্য ছিল, ভাগীরথ তাকে সন্তুষ্ট করে তার বন্ধুতার সাহায্যে পৌর্তিক কাজ শেষ করতে পেরেছিলেন। এত বড় পৌর্তিক কাজের মাহাত্ম্য কীর্তিত হবে, তাতে আর আশ্চর্য কি আছে?’ কপিল ভট্টাচার্যের এই অনুমানে আমরা আগে উল্লেখিত দীনেশ সরকারের উদ্ধৃতিতে ভাস্কর বর্মা হর্ষবর্ধনের সাথে সাক্ষাত করার সময় ব্রহ্মপুত্র ধরে সমুদ্রে নেমে আবারও ভাগীরথী বেয়ে বিহারে যাতায়াতের সম্ভাব্য একটা ব্যাখ্যাও পাই।

এই ‘পৌর্তিক কাজ’ এর অনুমান যদি সঠিক হয়, তবে আবার অন্য একটি জটিলতা তৈরি হয় দীনেশচন্দ্র-নীহাররঞ্জন এর অনুমানের সাথে, কেননা কপিল ভট্টাচার্যের অনুমানে তো পদ্মা আগে থেকেই অস্তিত্বশীল। পদ্মা ধরে সমুদ্রগামী না হবার কারণ সেক্ষেত্রে পদ্মার অস্তিত্বহীনতা নয়, কপিল এর ভাষায় ‘দুর্ধর্ষ অনার্যদের আবাস’। এখানে একটি কথা বলে রাখা দরকার, আর্য-অনার্যের এই বিভাজনটির অর্থ কিছুটা বদলে হাল আমলে তা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের বদলে সংস্কৃতিগত পরিচয়ে রূপ পেয়েছে। প্রথম যুগের ভারততত্ত্ববিদদের মত এখন আর বর্ণ ও জাতিভেদের অনড় অচল কাঠামোতে প্রাচীন সমাজকে বোঝার চেষ্টা করা হয় না, পুরনো ধারণা মোতাবেক এক একটা আস্ত নতুন জাতিকে বর্ণপ্রথায় নীচু শ্রেণীতে অন্তর্ভূক্ত করে ফেলার ব্যাখ্যা গ্রহণ না করার কারণ অজস্র বিপরীত উদাহরণ, যেখানে অন্তর্ভুক্ত নতুন জাতিগোষ্ঠীর উচ্চশ্রেণীকে বিশেষ করে ক্ষত্রিয় শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং একই জাতিভুক্ত বাকিরা বৈশ্য বা শুদ্রের মর্যাদা পেয়েছে। এ বিষয়ে আগ্রহীরা রামশরণ শর্মার শুদ্রাজ ইন এনশিয়েন্ট ইন্ডিয়া বা রোমিলা থাপার-এর ফ্রম লাইনেজ টু স্টেট গ্রন্থদুটির সাহায্য নিতে পারেন। আবার, নগরের উদ্ভব, বাণিজ্য প্রভৃতির বিকাশ অজস্র অসবর্ণ সমাজেরও ভিত্তি নির্মাণ করে। আরও অসংখ্য কারণে বহুক্ষেত্রেই বর্ণবিভাজনকে অটুট রাখা যায় নি। এমনকি বৌদ্ধ ধর্মের উদ্ভব যে এই বর্ণব্যবস্থা শিথিলতর হয়ে যাওয়া সমাজেই ঘটেছিল, সে বিষয়ক ধারণা গঠনে কোসাম্বী যুগান্তরকারী ভূমিকা রেখেছেন তার ভগবান বুদ্ধের জীবনীগ্রন্থটিতে। ক্রমরূপান্তরিত এই আর্যীকৃত সভ্যতা ক্রমশ বর্তমান বিহার, উরিষ্যা, পশ্চিমবঙ্গকে অভিভূত করে দক্ষিণ পুব দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, এবং এই সময় নাগাদ পূব বাঙলায় কিছু বিচ্ছিন্ন বৈদিক প্রভাবিত হিন্দু, বৌদ্ধ বসতি, রাজবংশ ইত্যাদি থাকলেও সাধারণ ভাবে দেশের পূর্বাংশের অধিকাংশটিই অনাবাদী ছিল, অপরপক্ষে পশ্চিমাংশ ইতিমধ্যেই বৈদিক প্রভাবিত জনগোষ্ঠী ও সমাজব্যবস্থা শক্তিশালী হতে শুরু করেছে।

যাহোক, পদ্মা গঙ্গার আদি প্রবাহ নয়, সে বিষয়ে উইলকক্স-এর সিদ্ধান্তকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন আরেক নদী-প্রকৌশলী এস সি মজুমদার। কপিল ভট্টাচার্যের বয়ানে ‘পদ্মার চেয়ে ভাগীরথীর প্রাচীনতা প্রমাণের জন্য শ্রীমজুমদার তাঁর নিজস্ব একটি বৈজ্ঞানিক ‘যুক্তি’র অবতারণা করেছেন: পদ্মা-মেঘনার দিকের অপেক্ষা ভাগীরথীর দিকে গঙ্গার ব-দ্বীপ বঙ্গোপসাগর অভিমুখে দৈর্ঘ্যে বড়।’ কিন্তু মজুমদার এর এই যুক্তি কপিল মেনে নেননি এই কারণে যে, বর্তমান ভাগীরথী-হুগলির দিকে গঙ্গার ব-দ্বীপ সৃষ্টিতে দামোদর, রূপনারায়ণ, কাঁসাই প্রভৃতি বহু প্রাচীন নদ-নদীর হাত রয়েছে। সত্য বটে তাদের অববাহিকা গঙ্গার তুলনায় অনেক ছোট, কিন্তু এরা পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূখ- ছোটনাগপুরের পার্বত্য অঞ্চল থেকে উদ্ভুত হয়েছে এবং লক্ষ লক্ষ বছর ওই অঞ্চলকে ক্ষয়িত করে বঙ্গোপসাগরে মাটি ফেলেছে। তারা যখন কাজ করেছে, তখনও হিমালয়ের জন্ম হয়নি। জন্মগ্রহণ করে হিমালয়ের পর্বতশৃঙ্গোর তুষার জমে উঠতেও বহুশত বছর লেগেছে, তারপর সেই সব গলিত তুষারের জল ক্রমশঃ হিমালয়ের প্রস্রবণ ও নদীগুলির সৃষ্টি করেছে। গঙ্গা-যমুনা-ঘর্ঘরা-কুশীর জন্ম হয়েছে আরও পরে।

‘পরবর্তী যুগে ভাগীরথীর সৃষ্টির পর, সেই পূর্বতন ব-দ্বীপের উপরে ভাগীরথীর পলি পড়েছে। সুতরাং এদিকে গঙ্গার দৈর্ঘ্য বৃদ্ধিতে ভাগীরথী-হুগলির যতটা হাত ছিল বলে শ্রী মজুমদার ধরে নিয়েছেন, তা ঠিক নয়।’ তিনি দেখিয়েছেন, নানান নৈসর্গিক বৈশিষ্ট্যের কারণেও মেঘনা-পদ্মার মুখের অঞ্চলে বদ্বীপের দৈর্ঘ্য বাড়েনি। এমনকি সমুদ্রস্থিত পলিমঞ্চের ধ্বসের ফলেও পূর্বাংশে বদ্বীপের আকৃতি হ্রস্বকায় হয়েছে বলে কপিল উল্লেখ করেছেন। বরিশাল জেলার ইতিহাস নামের গ্রন্থেও এই পলিমঞ্চের পতনের কারণে সাগরের ‘গান’ বলে কথিত শব্দের উল্লেখ আছে, যদিও আজকাল আর এই শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু সমুদ্রগর্ভে বদ্বীপের আকার দিয়ে কেন নদীর পলি সঞ্চয়ের প্রাচীনত্ব মাপা যাবে না, তার পক্ষে চূড়ান্ত যে যুক্তিটি কপিল ভট্টাচার্য দিয়েছেন, সেটিও ভাববার মতই একটি ভৌগোলিক পর্যবেক্ষণ: ‘ভারত মহাসাগরের অন্তর্গত বঙ্গোপসাগর, মার্তাবান সাগর ও শ্যাম সাগরে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র, ইরাবতী-সিটাং ও মেনাম-চাও-ভ্রায়া নদীর মোহনাগুলির মানচিত্র একটু নিবিষ্টভাবে দেখলে একটি বিষয়ে তাদের সামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। তিনটি মোহনারই পূর্ব দিকের অংশে ব-দ্বীপ পশ্চিম দিকের অংশের চেয়ে ভূখণ্ডের অভ্যন্তরে বেশী দূর ঢোকানো। আমার মনে হয়, যুগ যুগ ধরে জোয়ারের জলের দৈনন্দিন দুই বারের ক্রিয়া তাদের তিনটিকেই এই এক রকম আকৃতি দিয়েছে। পৃথিবী তার মেরুদণ্ডে পশ্চিম থেকে পূর্বে ঘোরে, কাজেই জোয়ারের গতি পূর্ব থেকে পশ্চিমে। তাই পূর্বের ব-দ্বীপের মুখ ভেঙে এনে সমুদ্রের জল ব-দ্বীপের পশ্চিমাংশে মুখের বৃদ্ধি সাধন করে। তাই পশ্চিমাংশে সাগর দ্বীপ প্রভৃতি গঙ্গার মোহনার দ্বীপগুলি পূর্বাংশের সন্দ্বীপ, হাতিয়া প্রভৃতি দ্বীপের চেয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতর।’ (অধুনা সুন্দরবনের নিচে আর পলিসঞ্চয় তেমন একটা ঘটছে না, মানুষের হস্তক্ষেপ এবং কিছুটা বদ্বীপের টেকটনিক সঞ্চালনের ফলে, খেয়াল করিয়ে দিয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানী, অন্তর্জালিক বন্ধু দীপেন ভট্টাচার্য– প্রাবন্ধিক)

এভাবে কপিল ভট্টাচার্যের যুক্তি অনুযায়ী বাংলা বদ্বীপের পশ্চিমাংশের ভূমি গঠিত হয়েছে গঙ্গা নদীরও জন্মের পূর্ববর্তী ছোটনাগপুর বিধৌত নদীসমূহ দিয়ে এবং পশ্চিমাংশের সমুদ্রঅভ্যন্তরে বেশিদূর বৃদ্ধি ভাগীরথী শাখার প্রাচীনত্বের কারণে অতিরিক্তকাল পলিসঞ্চয় নয়। পশ্চিমাংশের ভূভাগ প্রাচীন বটে, তবে তা ছোটনাগপুরের পাথুড়ে শিলাদ্বারা গঠিত। গঙ্গাবাহিত পলি দিয়ে প্রধানত গঠিত হয়েছে কেবল দ্বীপের পূবভাগেরই একটি অংশ। ফলে আদি¯্রােত বিষয়ক ধারণাটি আর মীমাংসিত থাকে না।

পাঁচ.

কিন্ত এই ভৌগোলিক যুক্তি ছাপিয়ে ওঠে সেই সাংস্কৃতিক প্রশ্নটি এবং কপিল স্পষ্টতই অভিযোগ তোলেন পদ্মা-ভাগীরথীর মাঝে কোনটি প্রাচীনতর, তা নির্ধারণে ভৌগোলিক যুক্তির চাইতে ধর্মীয় সংস্কারকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। বর্তমান নিবন্ধের উদ্দেশ্য কিন্তু কোনভাবেই এই ‘নির্ধারণে’র সঠিকতা নিরুপন নয় বরং এই সাংস্কৃতিক প্রশ্নটি বারবার কেন আসছে, তারই অনুসন্ধান প্রয়াস, কপিলের ভাষায় ‘দুঃখের বিষয় আর্যদের বিজয় অভিযানে ও হিন্দু সভ্যতা ও কৃষ্টির প্রচারে গঙ্গা ও ভাগীরথী এমনই এক প্রাধান্য পেয়েছে যে, তার সংস্কার থেকে মনকে মুক্ত রাখতে সমসাময়িক বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক সমীক্ষকগণ সমর্থ হননি।’

প্রকৃতি রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হলে জাতীয়তাবাদী অন্ধত্ব বিপর্যয়কর হতে পারে, পদ্মা বিষয়ে কপিল ভট্টাচার্য যে নজিরটি দিয়েছেন, সেটি এই অঞ্চলের প্রকৃতির ওপর সম্ভবত সবচে বড় পীড়নের ঘটনা। উইলকক্স ১৯২৮ সালে নদীয়া ব্যারেজের যে প্রস্তাব করেছিলেন, কপিল-এর বিচেনায় তা ভালো নয়, তবে মন্দের ভালো। এই ব্যারেজের লক্ষ ছিল ভাগীরথী, ভৈরব, মাথাভাঙা প্রভৃতি নদীর নাব্যতা রক্ষা। কিন্তু মজুমদার তাতে আপত্তি করেন পদ্মার খাতের বিপর্যয়ের সম্ভাবনা তুলে। তবে ’৪৭-এর দেশভাগের পর মজুমদার যে নদীয়া ব্যারেজেরই হীনতর এবং বহুগুণ ধ্বংসাত্মক সংস্করণ ফারাক্কা ব্যারেজের একজন উৎসাহী প্রবক্তায় পরিণত হন, সেটি কপিল ভট্টাচার্য তিক্ততার সাথেই লক্ষ্য করেন। ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন গ্রন্থে বাংলা বিভাগ প্রশ্নে বদরুদ্দীন উমর-এর একটি পর্যবেক্ষণ ফারাক্কা বাঁধ সম্পর্কে পরোক্ষ অর্থে প্রাসঙ্গিক: ‘অখ- ভারতে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে হিন্দু সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষার সুবিধা থাকায় কংগ্রেস জাতীয়তাবাদের মুখোশে নিজেদের সাম্প্রদায়িক চরিত্রকে যেভাবে আড়াল করে রেখেছিলো, তাদের সে মুখোশ বাঙলা বিভাগের সময় ছিন্নভিন্ন হল। তারাই তখন সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে বাঙলাকে বিভক্ত করার জন্য দাঁড়াল। অন্যপক্ষে যে মুসলিম লীগ নেতারা মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থ রক্ষার জন্য পাকিস্তান দাবী করছিলেন, তারা অখ- বাঙলার সংখ্যাগরিষ্ঠ হিসেবে নিজেদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থ সংরক্ষণের পথ দেখতে পেয়ে গ্রহণ করেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির জাতীয়তাবাদীর ভূমিকা।’

এবং এই ভাগাভাগির রাজনীতির শিকার হয়ে শেষ পর্যন্ত পদ্মা বলি হবে, ইতিহাস রচয়িতারা যাকে গঙ্গামাহাত্ম্যের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সূত্রে পৃথক একটি রাষ্ট্রের প্রধান নদী হবার সূত্রে অনায়াসে তাকে জীবনের অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা যাবে। এবং এইখানে ইতিহাসের আরেকটি অদ্ভুত রসিকতা, ইতিহাসবিদ রিচার্ড এম ইটন মনে করেন গঙ্গার মাহাত্ম্যবঞ্চিত পদ্মাবতীর ঢেউয়ে ঢেউয়েই পূর্ববঙ্গে ইসলামের বিকাশ ঘটেছে ।

ছয়.

বাংলার পূর্ব অঞ্চলে ইসলাম ধর্মালম্বীদের বিস্তৃতি বিষয়ে যতগুলো তত্ত্ব আছে, তার মাঝে অন্যতম প্রভাবশালী হলো ইটনের অরণ্য পরিস্কার করে কৃষি সভ্যতার বিস্তারের সাথে সাথে এই এলাকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ‘লৌকিক ধর্ম’ থেকে ‘বৃহৎ ধর্মে’ উত্তরণ, এবং মোঘল আমলে কৃষির সম্প্রসারণের প্রধান পর্বটিতে যেহেতু অরণ্য পরিস্কার করার ক্ষেত্রে মুসলিম অগ্রনায়করা সংখ্যাগত দিক দিয়ে বেশি ছিলেন, কাজেই এখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই বেশি হয়েছে। ইটনের এই অরণ্য পরিস্কার করার তত্ত্বে কিন্তু পদ্মার খাত পরিবর্তনের ধারণার একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তার মতে ‘ষোড়শ শতকের আগ পর্যন্ত পূর্ব বাংলা ছিল একটা ঘন অরণ্য অধ্যুষিত অঞ্চল, যেটি ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রধান কেন্দ্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে ইন্দো-আর্য সভ্যতার ছোঁয়া সামান্যই পেয়েছিল। বাংলার প্রাচীন নগরকেন্দ্রগুলোর বণ্টন ও আপেক্ষিক আকৃতি বিষয়ক পুরাতাত্ত্বিক উপাত্ত থেকে দৃশ্যমান হয় যে মৌর্য ও সেন আমলের মাঝে (খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক-খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতক) ব-দ্বীপের পশ্চিমাংশ পূর্বাংশের চাইতে বেশি জনঅধ্যুষিত ছিল। উচ্চতর নগরায়ন উচ্চতর পেশাগত বিশেষায়ন ও সামাজিক স্তরবিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়। ফলশ্রুতিতে ১২০৪ সালের তুর্কী বিজয়ের আগেই পশ্চিমবঙ্গ মোটাদাগে ইন্দো-আর্য সভ্যতার দ্বারা অনেক বেশি অনুপ্রবিষ্ট হয়ে পড়েছিল। ১৫৯০ নাগাদ বর্ধমানের বাসিন্দা কবি মুকুন্দরাম বিশদবিস্তৃত বর্ণাশ্রমের বর্ণনা করেছেন যেটি ওই সময় নাগাদ পশ্চিমবঙ্গে দৃশ্যমান হয়েছে। পূর্ববাংলার ক্ষেত্রে এমন কোন নিদর্শনের অস্তিত্ব নেই।’ (হু আর দি বেঙ্গল মুসলিমস?, রিচার্ড এম ইটন)

১৯৬০ সালের পদ্ম নদী। প্রাপ্তিসূত্র:http://www.skyscrapercity.com/showthread.php?t=1014015

১৯৬০ সালের পদ্ম নদী। প্রাপ্তিসূত্র:http://www.skyscrapercity.com/showthread.php?t=1014015

ইটন পূর্ব বাংলায় নগরায়ন ও জনসংখ্যার ঘনত্বের পক্ষে ব্যারি মরিসন কৃত লালমাই, এ কালচারাল সেন্টার অব আরলি বেঙ্গল: অ্যান আর্কিওলজিক্যাল রিপোর্ট অ্যান্ড হিস্টরিক্যাল অ্যানালাইসিস প্রবন্ধটিতে প্রদত্ত একটা হিসাবকেও তার এই প্রকল্পে ব্যবহার করেছেন: ‘ব্যারি মরিসন প্রাচীন বাংলার প্রধান ছয়টি রাজপ্রাসাদের মোট ক্ষেত্রফলের তুলনামূলক হিসাব করেছেন বর্গফুটে: পুন্ডনগর, ২,২৫,৫৫,০০০; পা-ুয়া ১,৩১,৮৬,৮০০; গৌড় ১,০০,০০,০০০; কোটিবরসা ২৭,০০,০০০; বিক্রমপুর ৮,১০,০০০; আর দেবপর্বত (লালমাই এ) ৩,৬০,০০০। বৃহত্তর চারটি বরেন্দ্রভূমি বা উত্তরপশ্চিমের নগরগুলোতে অবস্থিত, যেখানে বিক্রমপুর আর দেবপর্বত তুলনামূলকভাবে পূর্ব ও দক্ষিণপূর্বে অবস্থিত এবং অন্যগুলো থেকে বহুগুণ ছোট।’

পূর্ববাংলায় ছোট ছোট কিছু নগর ও রাজ্য গড়ে উঠলেও পশ্চিবঙ্গ পর্যন্ত যে বিস্তৃত নগরায়ন ও সাম্রাজ্যবিস্তার ঘটেছিল বহু আগেই, তা এখানে ঘটেনি। এর কারণ, ইটনের মতে, ‘দুটো প্রধান প্রতিবন্ধক ব-দ্বীপের পূর্বভাগে ব্রাহ্মণ্য সমাজের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে: গভীর অরণ্য, আর উর্ধ্বভারতের সাথে প্রত্যক্ষ নৌ যোগাযোগের অভাব। আজকের দিনে পশ্চিম বাংলায় বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ প্রায় ৫৫ ইঞ্চি, যেখানে মধ্য ও পূর্ববাংলা ৬০ থেকে ৯৫ ইঞ্চি বৃষ্টি পেয়ে থাকে, আর মেঘনামুখে এর পরিমাণ ১০০ থেকে ১২০ ইঞ্চি, সিলেটে ১৫০ ইঞ্চি। প্রাচীন আমলেও এই জলবায়ুগত ধরনটি বজায় ছিল ধরে নিলে সেই সময়ে শাল অরণ্যে আবৃত ব-দ্বীপের পশ্চাৎভূমিতে বৃক্ষের ঘনত্ব পূব দিকে ক্রমাগত বাড়তে থাকার কথা। এমনকি লৌহ যন্ত্রপাতির সাহায্যেও গাছ কেটে জঙ্গল পরিস্কার করার জন্য ব-দ্বীপের অপেক্ষাকৃত কম অরণ্যাবৃত পশ্চিমাংশের চেয়ে অনেক বেশি শ্রমবহুল আর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন পড়তো। পূর্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে অন্য অন্তরায়টি ছিল সুবিপুল গঙ্গানদী ব্যবস্থা থেকে অঞ্চলটির বিচ্ছিন্নতা। প্রাচীন আমলে গঙ্গা বদ্বীপের পশ্চিম অংশে বর্তমানের ভাগীরথ-হুগলী নৌপথ দিয়ে নিম্নগামী হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হত, এখানে নদীটি এখনো আদি-গঙ্গা নামে পরিচিত। এভাবে পূব বাঙলা গঙ্গাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকত। ধারাবাহিক পলি অবক্ষেপনের ফলে যদিও গঙ্গা অনেক আগে থেকেই এর সাবেক নদীবক্ষ থেকে উপচে পড়তে থাকে এবং পূবে নতুন পথ বের করে নেয়- ভৈরব, মাথাভাঙ্গা, গড়াই মধুমতি, আড়িয়াল খাঁ- যতক্ষণ না শেষ পর্যন্ত ষোড়শ শতকের শেষভাগে এটা পদ্মার সাথে সংযুক্ত হয়, এর ফলে প্রধান প্রবাহটি পূববাংলার গভীর অভ্যন্তরভাগ পর্যন্ত প্রবাহিত হতে সক্ষম হয়। ১৫৪৮, ১৬১৫, ১৬৬০ ও ১৭৭৯ সালের সালের ইউরোপীয় মানচিত্র এই নৌপথের পরিবর্তনকে পরিস্কারভাবে প্রদর্শন করে।’

‘গঙ্গার পূর্বমুখী যাত্রার ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। সবচে বড় কারণ এটা পূববাংলার অর্থনীতিকে বৃহত্তর বাজারের সাথে যুক্ত করে, কেননা এটা গভীর অরণ্যে আবৃত এবং ইতিপূর্বে বিচ্ছিন্ন একটা অঞ্চলকে উচ্চভারতের সাথে প্রত্যক্ষ বাণিজ্যিক যোগাযোগকে উন্মুক্ত করে। যদিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশাল এই নদীটির পূর্বমুখী সরণ এর সাথে বাঙালি সভ্যতার উপকেন্দ্রকেও নিজের সাথে বয়ে নিয়ে আসে, কেননা এর সাংবাৎসরিক বন্যা বিপুল পরিমাণ পলিকেও অবক্ষেপিত করতো যার ফলে রোপা আমন চাষ করা সম্ভবপর হয়, যেটা পরিণতিতে বহুগুণ বেশি ঘনত্বের জনগোষ্ঠীকে পালন করতে সক্ষম। ১৫৯৫ থেকে ১৬৫৯ সালের মাঝে মোঘল রাজস্বের দাবির পরিবর্তন ব-দ্বীপের বিভিন্ন ভাগে আপেক্ষিক উর্বরতার পরিবর্তন প্রতিফলিত করে, কেননা এই সংখ্যাগুলো জমির শস্য উৎপাদনের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করতো। ওই ৬৪ বছর কালপর্ব ধরে ব-দ্বীপের প্রতিবেশগত ভাবে সক্রিয় দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে রাজস্ব দাবি ১১৭ ভাগ বৃদ্ধি পায়, আর ৯৭ ভাগ বৃদ্ধি পায় উত্তর পূর্ব ভাগে। অন্য দিকে এটা মাত্র ৫৪ ভাগ বৃদ্ধি পায় তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় দক্ষিণপশ্চিম ভাগে, যেখানে প্রতিবেশগতভাবে উষরপ্রায় উত্তরপশ্চিমভাগে এটা কার্যত ১৩ ভাগ হ্রাস পায়।

‘উপরন্তু গঙ্গার সাথে পদ্মার একীভবন এমন একটি মুহুর্তে ঘটলো যখন পুরো বাংলা অঞ্চল দক্ষিণ এশিয়ায় আবির্ভূত সবচে বড় সাম্রাজ্যিক ব্যবস্থা আকবরের অধীন মোঘল সাম্রাজ্যের গ্রাসে পতিত। বদ্বীপের উত্তরপশ্চিম ভাগে (যেমন গৌড়, পা-ুয়া, টান্ডা) রাজধানী স্থাপন করা বাঙলার এর আগেকার মুসলমান শাসকদের থেকে স্বতন্ত্র মোঘলরা তাদের প্রাদেশিক রাজধানী স্থাপন করলো বদ্বীপের পূবভাগের একেবারে গভীর অভ্যন্তরদেশেÑ ঢাকায়। এর মানে হলো এই প্রথমবারের মত আগে যা ছিল অনুন্নত, অপ্রবেশ্য এবং ঘন অরণ্যে আবৃত পশ্চাৎভূমি, সেই পূব বাংলা ঘনীভূত ও অতিমাত্রায় গতিশীল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকাশের কেন্দ্রে পরিণত হলো। বস্তুত ষোড়শ শতকের শেষ ভাগের মাঝেই বাংলায় এত বেশি উদ্বৃত্ত শস্য উৎপাদন হতে থাকল যে চাল এর প্রধান একটি রফতানি-শস্যে পরিণত হলো, যেটি আগে কখনো ঘটেনি। পূর্বে চট্টগ্রাম আর পশ্চিমে সাতগাঁও এই দুটি প্রধান সমুদ্রবন্দর থেকে ভারত মহাসাগর জুড়ে পশ্চিমে গোয়া আর পূর্বে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ার মালাক্কা পর্যন্ত চাল রফতানি হতো। ১৬৭০ সালের পর পূর্বমুখী রফতানি হ্রাস পেতে থাকলেও সতের শতকের পুরোটা আর অষ্টাদশ শতকের বড় সময় জুড়ে নিম্নবঙ্গে চাল দরে সস্তা আর পরিমাণ পর্যাপ্ত ছিল। এই দিক দিয়ে চাল এবার যুক্ত হলো সুতীবস্ত্রের সাথে, ব-দ্বীপটির এটাই ছিল ১৫ শতকের অন্তত শেষ দিক থেকে প্রধান আর অন্তত দশম শতাব্দী থেকে গুরুত্বপূর্ণ রফতানি পণ্য। সন্দেহাতীতভাবেই ব-দ্বীপটির বস্ত্রশিল্পই পর্তুগীজ, ওলন্দাজ আর ইংরেজ বণিকদের আকৃষ্ট করেছিল আর সতের শতকের শেষ দিক নাগাদ বাংলা আবির্ভূত হলো পুরো এশিয়ার মাঝে একক ভাবে সবচে গুরুত্বপূর্ণ পণ্যসরবরাহকারী হিসেবে। তাঁতে বোনা কাপড়ের বিনিময়ে ইউরোপীয় ও এশিয় বণিকেরা ব-দ্বীপটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ রৌপ্য ঢেলেছিল যেটা টাকশালে রুপান্তরিত হয় মুদ্রায়, আর স্থানীয় অর্থনীতিকে মুদ্রা-অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে এটা দ্রুত-প্রসারমান আবাদী-সীমান্তকে আরো গতিশীল করে।

‘ব-দ্বীপের প্রতিবেশগতভাবে সক্রিয় অংশে এবং আরও সুনির্দিষ্টভাবে বললে পূর্ববাংলার কৃষিসীমান্তের অগ্রগণ্য এলাকাগুলোতে সূচনাকারী ব্যক্তিরা হলেন অরণ্যে আবাদ পত্তনকারী অগ্রগামী আবাদীগণ যারা অর্থনৈতিক ভাবে ভূমির আর রাজনৈতিক ভাবে বর্ধিষ্ণু মোঘল রাষ্ট্রের বন্ধনে আবদ্ধ ছিলেন। তাদের অস্থির আর অনুন্নত পূবসীমান্তে স্থিতিশীলতা আনতে উৎসুক মোঘলারা ব-দ্বীপের পূর্বাংশের একেবারে ভেতরে তাদের প্রাদেশিক রাজনধানী স্থাপন করেই বসে থাকল না। অনুন্নত অরণ্যভূমি পরিস্কার করে তাকে আবাদের আওতায় নিসে আসবে এমন উদ্যমী ব্যক্তিদেরকে মোঘলরা সুবিধাজনক, এমনকি নিষ্কর জমি বরাদ্দ করল। এই নীতির লক্ষ্য ছিল এমন স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকাশ ঘটানো যারা হবে অর্থনৈতিকভাবে উৎপাদনশীল আর রাজনৈতিকভাবে অনুগত। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে এই জাতীয় বরাদ্দ পাওয়া সকলকেই তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রজাদের ভালমন্দ দেখভাল আর মোঘল রাষ্ট্রের দীর্ঘজীবিতার জন্য প্রার্থনা করতে হতো। মধ্য-সতেরো শতক থেকে ১৭৬০ সালে বৃটিশ রাজশক্তির অভিষেক পর্যন্ত শত শত মোঘল দলিলপত্র থেকে এই অগ্রগামী পত্তনিকাররা যেভাবে অরণ্যের গহীনতর অঞ্চলে ঢুকে পড়েছিল আর এই কাজের জন্য স্থানীয় শ্রমশক্তিকে সংগঠিত করেছিল, তার বর্ণনা পাওয়া যাবে। স্থানীয় শ্রমিকদের এ কাজে নিয়োজিত করা হয়েছিল বলে এই পত্তনিকাররা পূর্ব বদ্বীপের আর্থসামাজিক বিকাশে একটা নির্ধারণমূলক ভূমিকা পালন করে। তাদের ভূমিকার মধ্যস্ততায় এই অঞ্চলের বড় অংশে রোপা আমন ধানের আবাদের সূচনা বা ঘনীভবন ঘটে, এর পূর্বে প্রধানত শিকার, মাছ ধরা বা জুম চাষের সাথে জড়িত স্থানীয় জনসম্প্রদায় রোপা আমন ধান চাষে উত্তরোত্তর বেশি সময় কিংবা সম্পূর্ণ সময় জুড়ে নিয়োজিত হতে শুরু করে।

‘অগ্রগামী পত্তনিকাররা এই অঞ্চলের ধর্মীয় বিকাশেও নির্ধারক ভূমিকা পালন করে, কেননা জমির অনুদান পাবার একটা অন্যতম প্রধান শর্ত ছিল ওই জমিতে উৎপাদিত সম্পদ থেকেই চিরস্থায়ীভাবে পরিচালিত হবে এমন একটি মসজিদ বা মন্দির স্থাপন করার বাধ্যবাধকতা। অনুদানপ্রাপ্ত হিন্দু প্রতিষ্ঠানগুলোর (ব্রহ্মত্তোর, দেবোত্তর, বিষ্ণুত্তোর, শিবোত্তর) ঝোঁক ছিল স্থানীয় জনসম্প্রদায়কে হিন্দুধর্মীয় সাংস্কৃতিক কাঠামোর জগতে অন্তর্ভূক্ত করার, যেখানে মসজিদ বা মাজার নির্মাণের অনুমোদন দিয়ে প্রদত্ত অনুদান এ জাতীয় জনসম্প্রদায়কে মুসলিম ধর্মীয় সাস্কৃতিক কাঠামোর মাঝে অন্তর্ভুক্ত করতে। পরবর্তীকালের জনগোষ্ঠীর সংখ্যাতাত্তিক বিন্যাসের ধরন এই পূর্ববর্তী প্রক্রিয়া থেকেই বিকশিত হয়েছে। যাহোক, অধিকাংশ পত্তনিকার মুসলিম ছিলেন বলে এভাবে প্রতিষ্ঠিত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই ছিল মসজিদ, এরই ফলাফল হলো পূববাংলার অর্থনৈতিক সীমান্তে যে প্রাধান্যশীল উপাসনা-পদ্ধতিটি বিবর্তিত হলো, সেটি ইসলামী। নিশ্চিতভাবেই মসজিদগুলো স্থাপত্যের দিক দিয়ে মোঘলরা নগরগুলোতে পাথর বা ইট নির্মিত বিশালাকার ধর্মীয় স্মৃতিসৌধগুলোর ধারেকাছেও তুলনীয় ছিল না। বরং এগুলো ছিল বাঁশ আর খড় দিয়ে বানানো অনাড়ম্বর কাঠামো।’

শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর আঁকা padma boat of the bank of river padma. প্রাপ্তিসূত্র : http://rabindranathtagore-150.gov.in/images/gallery/folder-2/gallery-large-22.jpg

শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর আঁকা padma boat of the bank of river padma. প্রাপ্তিসূত্র : http://rabindranathtagore-150.gov.in/images/gallery/folder-2/gallery-large-22.jpg

এভাবে পূর্ববাংলায় কৃষিসভ্যতার বিস্তার এবং সেই সাথে ইসলাম ধর্মের (তুলনামূলক কম হলেও হিন্দু ধর্মেরও) বিস্তার এবং লৌকিক ধর্মাচারী শিকারী, মৎস্যজীবী, আহরণজীবী ও জুমচাষী জনগোষ্ঠীগুলোকে এই বিস্তারীকরণে যুক্ত করার কাজটি দ্রুততর হতে থাকলো গঙ্গার সাথে পদ্মার মিলনের ফলশ্রুতিতে। কেননা যেখানে হিন্দু সভ্যতা ইতিমধ্যে স্থানীয় জনসাধারণের মাঝে প্রবেশ করে ফেলেছে এমন পুরনো নদী উপত্যকাসমূহ বাদ দিলে পুর্বের পশ্চাৎভূমির অধিকাংশ অঞ্চলেরই বাসিন্দা ছিল এমন সম্প্রদায় যারা হিন্দু সভ্যতা ও এর ‘স্বাক্ষরতার সংস্কৃতির’র স্পর্শ সামান্যই পেয়েছিল বা আদৌ পায়নি। কাজেই পূর্বে ইসলাম কেবল কুঠার আর লাঙ্গলের ধর্মই না, কিতাবের ধর্ম হিসেবেও উপলদ্ধ হল।

সাত.

ইটনের তত্ত্বের সাথে অবশ্য উইলকক্স, কপিল ভট্টাচার্য প্রমুখ নদী বিশেষজ্ঞের অনুমানের একটাই ফারাক, প্রথমোক্তগণ পদ্মাকে গঙ্গার স্বাভাবিক ও প্রাচীনতম প্রবাহ বলে ঘোষণা করেন, ইটন তা মনে করেন না। গঙ্গা তার হিসেবে ষোড়শ শতকের কোন একটা পর্বে পদ্মার সাথে মিলিত হয়েছে। কিন্তু পদ্মার খাতটি বা পূর্বমুখী অন্য আর কোন প্রবাহ গঙ্গার প্রাচীনতম প্রবাহ হয়ে থাকলেও ইটনের তাৎপর্য তাতে একদমই ম্লান হয় না। কেননা আমরা আগেই দেখেছি পদ্মা অজস্রবার খাত বদল করেছে এবং প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ পলি গঙ্গা নদী তার স্রোতের সাথে বহন করে নিয়ে আসে। ফলে প্রাচীন ও অনৈতিহাসিক ভূতাত্ত্বিক কালে গঙ্গার পূর্বমুখী স্বাভাবিক প্রবাহগুলিও মজে যেতে পারে, যে কারণে হয়তো পদ্মা চর্যাপদে ‘পউয়া খাল’ বা দীনেশচন্দ্রর অনুমানে ইদিলপুরের শাসনে উল্লেখিত পদ্মা ‘গঙ্গার সাথে সম্পর্কহীন’। এই মধ্যবর্তী পর্যায়গুলোতে ভাগীরথীসহ অন্যান্য নদীগুলো কাটা হয়ে থাকলেও তারাও সুপ্রচুর পলিস্তুপে ভরাট হবার কারণে আবারও গঙ্গা পূর্বমুখী হতে পারে, আইন ই আকবরীর উল্লেখও এই মতটিকে সমর্থন করে, ১৫৬৭ সালে ভেনেশিয় পর্যটক সিজার ফ্রেডরিকি উল্লেখ করেন যে আদিগঙ্গায় ইতিমধ্যেই সাতগাঁও (বর্তমান কোলকাতার নিকটে) বন্দরের উত্তরে জাহাজ যেতে পারছে না। এর সাত বছর পর আবুল ফজল লেখেন যে টান্ডার নিকট গঙ্গা দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে, এক ভাগ সাতগাঁও এর দক্ষিণে প্রবাহিত হচ্ছে আর অন্যভাগ পূর্বদিকে সোনারগাঁও ও চট্টগ্রামের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে। ১৬৬৬ নাগাদ পুরনো গঙ্গার খাতের এত বেশি অবনতি ঘটে যে এটা সম্পূর্ণ নাব্যতা হারায়।

আট.

কিন্তু ষোড়শ শতকের আগে পদ্মার সাথে গঙ্গার সম্পর্কহীনতা বিষয়ক দীনেশ, ইটন প্রভৃতির ধারণা প্রশ্নের মুখে পড়ে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণিক দলিলের কল্যাণে। পঞ্চদশ শতকের কবি কৃত্তিবাস ওঝা, নদীয়ার বাসিন্দা ছিলেন তিনি, বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী তার জীবনকাল ১৩৮১-১৪৬১। পঞ্চদশ শতকের প্রথম ভাগে গিয়াসউদ্দীন আজম শাহ (রাজত্বকাল ১৩৯০-১৪১১) রাজা গণেশ (রা ১৪১৫-১৮) অথবা জালালুদ্দীন মাহমুদ শাহ (রা. ১৪১৮-১৪৩১) কিংবা রুকনুদ্দীন বরবক শাহ (রা.১৪৫৯-১৪৭৪) কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে বাংলায় রামায়ন রচনা করেন। অন্তর্জালে প্রাপ্ত দুটো ইংরেজি অনুবাদে নেই, রাজশেখর বসুর ‘বাল্মিকী রামায়নের’ অনুবাদেও নেই, এমন একটা বিষয়ের উল্লেখ পেলাম ‘কৃত্তিবাসী রামায়নে’। স্বর্গ থেকে গঙ্গার অবতরণ এবং ভগীরথ তাকে পথ দেখিয়ে পূর্বপুরুষের ভস্মের দিকে চালিত করার কিংবদন্তীতে তিনি সম্ভবত আর একটি কাহিনী প্রবিষ্ট করিয়ে দিয়েছেন, হতে পারে তা তার সময়ের জনপ্রিয় কাহিনী, হতে পারে তা তার নিজের উদ্ভাবন। কিন্তু আমরা আমাদের জানা নথিগুলোর মাঝে এখানেই পদ্মাবতী যে মা গঙ্গার সাথে সম্পর্কিত, সেটা প্রথমবারের মত পাই। কিন্তু সেই জন্ম কাহিনী সুখকর না, নিন্দায় ভরপুর। শুনুন তবে,

আগে যায় ভগীরথ শঙ্খ বাজাইয়া/ কাণ্ডারের প্রতি গঙ্গা মুক্তিপদ দিয়া।

গৌড়ের নিকটে মিলিল আসিয়া।।/পদ্মা নামে এক মুনি পূর্ব্বমুখে যায়।

ভগীরথ বলি গঙ্গা পশ্চাতে গোড়ায়।।/যোড়হাত করিয়া বলিলেন ভগীরথ-

পূর্ব্বদিকে যাইতে আমার নাহি পথ।।/পদ্মমুনি লয়ে গেল নাম পদ্মাবতী।

ভগীরথ সঙ্গেতে চলিল ভাগীরথী।।/শাপবাণী সুরধুনী দিলেন পদ্মারে।

মুক্তিপদ যেন নাহি হয় তব নীরে।।

এই কাহিনীতে আসল প্রবাহ হবার কথা ছিল ভাগীরথীরই, কিন্তু পথে পদ্মামুনি পূর্বদিকে ভুলিয়ে নিয়ে এলেন নদীটিকে। সুরধুনী (গঙ্গার একটি শাখা, আবার গঙ্গার একটি নামও বটে, এখানে দ্বিতীয় অর্থেই ব্যবহৃত) পদ্মাকে অভিশাপ বাণী দিলেন, যেন তার নীড়ে মুক্তিপদ নাহি হয়।

কৃত্তিবাসী এই উল্লেখ কিন্তু দুটো প্রশ্ন ফয়সালা করে, প্রথমত ইটন প্রমুখদের কথিত সময়ের আগেই গঙ্গার সাথে পদ্মার একটা সম্পর্কের একটা স্বীকৃতি এখানে পাওয়া যাচ্ছে, বাতিল হচ্ছে দীনেশচন্দ্র সরকারের যাবতীয় অনুমান। তাদের অনুমান অনুযায়ী এই মিলনটি আরও বহু পরে ঘটেছিল। শুধু যে পদ্মাকে গঙ্গার সাথে যুক্ত দেখেছেন কৃত্তিবাস, তাই নয় ,

এগার নিবরে যখন বারতে প্রবেশ/ হেন বেলা পড়িতে গেলাম উত্তরের দেশ।।/ বৃহস্পতিবারের বেলা ঊষা পোহালে শুক্রবার/ বারেন্দ্র উত্তরে গেলাম বড় গঙ্গাপার

এখানে শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে তিনি বরেন্দ্রভূমি পৌঁছাতে বড় গঙ্গা পাড়ি দিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন, ভৌগোলিক বিচারে এই বড় গঙ্গা পদ্মা, তার রচনায় পুন্যতীর্থ ভাগীরথীরকেই ছোটগঙ্গা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকে পরিস্কার যে, কৃত্তিবাসের কালেই পদ্মা গঙ্গার অধিকাংশ জল নিষ্কাষণ করছিল। শাখা দ্বয়ের প্রাচীনতা বিষয়ক কোন চূড়ান্ত ভৌগোলিক সিদ্ধান্তে অবশ্য এ থেকে পৌঁছান যায় না, তার প্রয়োজনও নেই। কিন্তু চর্যাপদের পউয়া খাল যে অনতিবিলম্বে অতিকায় গঙ্গার প্রধান জলবাহী শাখায় রূপান্তরিত হলো, তার স্বীকৃতি এখানে বিদ্যমান।

কৃত্তিবাসের উল্লেখও বিতর্কমুক্ত নয় বটেই। কেননা সদ্যপ্রদত্ত পাঠটি ইতিহাসবিদ আবদুল করিম থেকে নেয়া, বৃহৎবঙ্গের রচয়িতা প্রণম্য দীনেশচন্দ্র সেন কিন্তু আমাদের সতর্ক করেছেন কৃত্তিবাসী রামায়ণের অনেকগুলো পাঠ রয়েছে। বড়গঙ্গা তার বিবেচনায় যে শহরে অবস্থিত, পাঠের যে সংস্করণটি তার কাছে প্রামাণ্য, সেখানে ওই উদ্ধৃতির শেষ বাক্যটাতে বারেন্দ্রর বদলে আছে ‘পাঠের নিমিত্তে গেলাম বড় গঙ্গাপার।’ এমনি নানান পাঠের ধর্মীয়-রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও দীনেশচন্দ্র দিয়েছেন: ‘আমার মনে একটি গভীর সন্দেহ আছে। শাক্ত ও বৈষ্ণবের দ্বন্দ্ব বঙ্গসাহিত্যের পুষ্টিসাধনে নানারূপে সাহায্য করিয়াছে। বৈষ্ণবগণ রাক্ষসদিগের দ্বারা শ্রীরামের স্তবগান করাইয়াছেন; খেদ মিটাইতে শাক্তগণ শ্রীরামকে দিয়া চন্ডীপূজা করাইয়াছেন; এই দুই দলের চেষ্টায় মূল-অনুবাদ বর্ত্তমান আকারে পরিণত হইয়াছে।’ কৃত্তিবাস বিষয়ক এই জটিলতাটুক্ওু পাঠকদের অবগত হয়ে থাকা জরুরি, পদ্মাবতীর জন্ম নিয়ে তার জল্পনার নিয়েই আরো বহু গবেষণা আর জল্পনার অবকাশ আছে। গুরুত্বপূর্ণ আরেক ইতিহাসবিদ নীহাররঞ্জন এর মতে আবার বড় গঙ্গা বলতে পদ্মাকেই বোঝান হয়েছে : ‘ছোটগঙ্গা বড় গঙ্গা বড় বলিন্দা [নিঃসন্দেহে বরেন্দ্র-বরেন্দ্রী পার। যথা তথা কর‌্যা বেড়ায় বিদ্যার উদ্ধার।]’ কৃত্তিবাসের রচনায় প্রথমবারের মত পদ্মার একটি শাপযুক্ত জন্মকাহিনী যুক্ত থাকায় অনুমান করা যায় যে, বড়গঙ্গা বলতে পদ্মাকেই বোঝান হয়েছে।

কিন্তু দ্বিতীয় প্রসঙ্গটি আরও গুরুতর, এবং তা কপিল ভট্টাচার্যের অনুমানের সাথে সাযুজ্যপূর্ণ। পদ্মা শুধু গঙ্গার মাহাত্ম্যবঞ্চিতই নয়, সে একটি শাপগ্রস্ত নদীও বটে, কারণ তা পূবমুখে গমন করেছে। গঙ্গোপধ্যায়কূলজাত পূর্ববঙ্গের বাসিন্দা কৃত্তিবাসের পূর্বপুরুষ রাজনৈতিক গোলযোগে পশ্চিমবঙ্গে আবাস গেড়েছিলেন, পদ্মানদীর অস্তিত্বে বাস্তবতা এড়িয়ে যাওয়া তার পক্ষে হয়তো সম্ভবপর ছিল না। কিন্তু কোন পূণ্যতীর্থহীন বিশাল এই পদ্মার অস্তিত্বকে তো কোনভাবে ব্যাখ্যা করতে হবে। ব্যাখ্যা দাঁড়ালো এই: পদ্মা দেবতাদের আকাক্সক্ষায় ব্যত্যয় ঘটিয়েছে, তার ‘নীড়ে মুক্তিপাদ’ হয় না, ফলে সেখানে সদা অস্থিরতা।

দেবতাদের আকাক্সক্ষায় ব্যত্যয়!

দেবতাদের আকাক্সক্ষার ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন আর একজন নারী, দেবকূলে জন্ম বলে তিনি দেবীপদবাচ্যও বটেন। তিনি মা মনসা। তার জন্মপ্রক্রিয়াটিও ঠিক সুবিধাজনক নয়, আর সৎ মা চণ্ডী তাকে শিবেরই উপপত্নী ভেবে এক চোখ কানাও করে দিয়েছিলেন। প্রতিশোধ নিতে তিনি নেমে যান পাতালপুরীতে, প্রতিজ্ঞা করেন শিবের উপাসকদের বাধ্য করবেন পূজো দিতে। কাহিনীটি অতি পরিচিত, চাঁদ সওদাগর মনসা পূজোয় অস্বীকার করলে নিষ্ঠুর মনসা একে একে তার সকল পুত্রকে হত্যা করেন। অবশেষে অনমনীয় চাঁদ সওদাগর বা হাতে হলেও মনসাকে পুস্পার্ঘ্য দিতে বাধ্য হন।

শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অাঁকা পদ্মা। প্রাপ্তিসূত্র: http://indiapicks.com/Indianart/Main/G_Tagore_Gallery.htm

শিল্পী গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর অাঁকা  Early morning of the River Padma প্রাপ্তিসূত্র: http://indiapicks.com/Indianart/Main/G_Tagore_Gallery.htm

মা মনসারই আরেকটি নাম পদ্মাদেবী; কৃত্তিবাসের জল্পনার ‘পদ্মমুনি’ (পুরুষবাচক যদিও) নামটার মাঝে উঁকি দেয়া ‘পদ্ম’, নদীটিকে ‘পদ্মাবতী’ বলে সম্বোধন, এবং সত্যি সত্যি মা মনসার আরেকটি নাম ‘পদ্মাবতী’, এই কাকতালে যে প্রক্রিয়ায় কিংবদন্তী গড়ে ওঠে, সম্পর্ক আবিষ্কৃত হয়, তার সকল লক্ষণ, অপ্রতিষ্ঠিত হলেও বর্তমান। এমনকি নীহাররঞ্জন এর মতো ইতিহাসবিদও ভাগীরথী আর পদ্মার তুলনা করতে গিয়ে মন্তব্য করেন: ‘হিন্দুর স্মৃতি ঐতিহ্যে গঙ্গার জলই পাপমোচ করে, পদ্মার নয়। গঙ্গা স্নিগ্ধা, পাপহরা। পদ্মা কীর্তিনাশা; পদ্মা ভীষণা ভয়ংকরী উন্মত্তা।’ এই বর্ণনাটি মনসার উদ্দেশ্যে প্রণোদিত না হলেও ভদ্রলোকী মনোজগতে পদ্মাবতী বা মনসার বেলাতেও এই একই বিশেষণসমূহ পুরোপুরিই প্রযোজ্য হতে পারতো।

নদী পদ্মাবতীর সাথে দেবী পদ্মাবতীর এই সাদৃশ্য নিশ্চিতভাবেই কল্পিত, তবে দুঃসাহসী নয়। এই পথ ধরেই কিংবদন্তীরা জন্ম নেয়।

নয়.

কিন্তু পদ্মাবতী বা মনসামঙ্গলের কাহিনীর যে সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যাটি সাধারণভাবে প্রদান করা হয়, সেটি আমাদের এ প্রসঙ্গে স্মরণ করাটা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। একদা লৌকিক ও অনার্য দেবতা হলেও শিব ঠাকুর ক্রমশ বৈদিক দেবতাকূলে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠা পান। তার পূজাপ্রক্রিয়া জটিল, আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই আর্যীকরণের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আর্যসভ্যতার বিস্তারে নতুন নতুন অন্যতর জাতিগোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্তিই প্রকাশিত, এইভাবে সিন্ধু নদ কেন্দ্রীক আর্যরা গঙ্গা তীরে বসতি গড়ে তোলে, উর্ধগঙ্গায় কুরুক্ষেত্রে গোষ্ঠীকেন্দ্রীক আর্যদের আখ্যানই ‘মহাভারত’। ক্রমশ তাদের আরও বিস্তৃতি ঘটে মধ্যগঙ্গায়, অযোধ্যার রাম নগরসভ্যতা গড়ে ওঠা আর্যদের আখ্যানের নায়ক (যদিও মহাভারতে রামায়নের কাহিনীর প্রাচীনতা প্রমাণের লক্ষ্যে ভীমকে হনুমানের উত্তরপুরুষ এবং বৃদ্ধ হনুমানের সাথে ভীমের সাক্ষাৎ এর উল্লেখ আছে, তথাপি সংস্কৃতি, রাজনীতি, নগর, অর্থনীতি, নারীর অবস্থান প্রভৃতির পাঠ থেকে রোমিলা থাপার সমেত বড় অংশের আধুনিক ইতিহাসবিদই মনে করেন কাহিনী হিসেবে মহাভারত প্রাচীনতর), মধ্যগঙ্গারই প্রধান সাম্রাজ্য হয়ে ওঠা মগধ থেকে বাঙলা, উরিষ্যা, আসাম এলাকায় বৈদিক সংস্কৃতির বিস্তার ঘটতে থাকে। মগধের উল্লেখযোগ্য ধর্ম ছিল বৌদ্ধমত, কারণ বাণিজ্য সংশ্লিষ্টতা আর নগরকেন্দ্রিক জীবন বর্ণাশ্রমকে অটুট রাখতে আর সমর্থ হচ্ছিল না, যাগযজ্ঞকেন্দ্রিক বৈদিক ধর্ম ক্রমাগত অপাঙতেয় হতে থাকে, সমাজে শেঠ বণিকদের গুরুত্বও বিকশিত হয়, এমনকি মনুর বিধানে পুরুষের অধীনস্ত হয়ে থাকার কথা যে নারীদের, বৌদ্ধ স্তুপে তাদের দান ধ্যান করার নিদর্শন এই যুগে পাওয়া যায়। কিন্তু এর পরই ঘটে একটি ব্রাহ্মণ্যপুনরুত্থান, বৌদ্ধধর্মের উচ্ছেদ ঘটে। এই পুনরুত্থানের যুগে শিব হন প্রধান দেবতায়, শৈব সম্প্রদায় রাজকীয়আনুকূল্য পেতে থাকে, আর বহু সংখ্যক ইতোপূর্বে আর্য ধর্মকাঠামোর বাইরে থাকা জনগোষ্ঠী ও তাদের রাজন্যবর্গ শৈবধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে এই নতুন পর্বের আর্যসভ্যতার বিস্তারে আরও অধিকহারে অনার্যচিহ্ন থাকা সত্ত্বেও তা শেষ বিচারে নতুন উচ্চকোটির বাহন হয়ে দাঁড়ায়। বাঙলায় মঙ্গলকাব্যগুলো মধ্যযুগের যে সময়টিতে রচিত হচ্ছিল, সেই সময় নাগাদ অনার্য শিব উচ্চবর্ণের প্রধান দেবতা, চ-ীও কোন কোন ক্ষেত্রে তাই। সেই তুলনায় মনসা তখনও অনার্য, এবং তার পূজারীরা হিন্দু ধর্মের কাঠামোর মাঝে সম্পূর্ণ প্রবেশ করেননি তখনও। আর্যীকরণ যে ধীরে হলেও সম্পন্ন হচ্ছিল তা টের পাওয়া যাবে নীহাররঞ্জনের এই সাক্ষ্যে: ‘ত্রিপুরারাজ বিজয়মানিক্য ১৫৫৯ খ্রীস্টাব্দে ত্রিপুরা হইতে ঢাকায় আসিয়া ইছামতী বাহিয়া যাত্রাপুরে আসিয়া পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করিয়াছিলেন। চৈতন্যদেবও (জন্ম ১৪৮৫) ২২ বৎসর বয়েসে পূর্ববঙ্গ ভ্রমণে আসিয়া পদ্মাবতীতে তীর্থস্নান করিয়াছিলেন, কোনও কোনও চৈতন্য-জীবনীতে এইরূপ উল্লেখ পাওয়া যায়। ষোড়শ শতকেই পদ্মা এবং ইছামতী প্রসিদ্ধা নদী, তাহার কিছু তীর্থমহিমাও আছে…।’ তবে এই সময় নাগাদ মুসলমানদের আগমন আর্যীকরণের সাবেকী গতিকে নতুন মাত্রা প্রদান করে, সেখানে নদীর ধর্মীয় মাহাত্ম্য পাবার সম্ভাবনা যায় কমে। মঙ্গলকাব্যের পুরাতন ও নতুন দেবতাগণের সংঘাতের চিত্রটি এই মুসলমানী রাজক্ষমতার প্রেক্ষাপটেই রচিত।

লৌকিক দৈবশক্তিগুলোর প্রতিষ্ঠাই মঙ্গলকাব্যের সাধারণ বিষয়। চণ্ডীমঙ্গলে দেবী চণ্ডী অরণ্যচারী শিকারী কালকেতুকে নগর প্রতিষ্ঠার আদেশ দেন। মনসামঙ্গল বা মনসাবিজয়ের তাৎপর্য আরও গভীর। এইখানে বস্তুত এই দুই অংশের সংঘাত আরও তীব্রভাবে দেখা দেয়। এবং তুলনীয় আর একটি পুরাতন কাহিনীও স্মরণে আসে না যেখানে লৌকিক চরিত্রটি হার না মেনে, একলব্যের কাহিনীর মতই ঈর্ষাতুর অর্জুনের দাবি মোতাবেক দ্রোণাচার্যের গুরুদক্ষিণাবাবদ বৃদ্ধাঙ্গুল বিসর্জন দিয়ে নীরবে সরে গিয়ে আর্যশ্রেষ্ঠত্বকে জায়গা করে দেয়নি। মহাভারতে আরেকটি চরিত্রর কথা বলা যেতে পারে অবশ্য, সেও আর্যবর্তের নন, আমাদের অঞ্চলেরই। সভাপর্বে, কৃষ্ণযুধিষ্ঠিরাদির মন্ত্রণায় কৃষ্ণ বলছেন: ‘যে দুর্মতি নিজেকে পুরুষোত্তম ও বাসুদেব বলে প্রচার করে এবং আমার চিহ্ন ধারণ করে, সেই বঙ্গ-পুণ্ড্রর-কিরাতের রাজা পৌণ্ড্রকও জরাসন্ধের পক্ষে গেছে’। অচিরেই এই পৌণ্ড্ররক নিহত হয়ে তার ঔদ্ধত্যের সমুচিত শাস্তি পান, এই পৌণ্ড্রকও সংগঠিত রাজশক্তিরই প্রতিনিধি, যিনি অনার্য জনশক্তির প্রতিনিধিত্ব করলেও ইতোমধ্যেই আবার ক্ষত্রিয়কূলে ঠাঁইও করে নিয়েছেন।

কিন্তু মনসা নিষ্ঠুর, অদম্য এবং নতুন আমলটিতে অপ্রতিরোধ্য। হিন্দু দেবকূলে অন্তর্ভুক্ত এই প্রথম একজন যার অন্তর্ভুক্তিতে ঐশী, দৈবিক মহিমা ও পবিত্রতা আরোপিত হয়নি, বরং নিষ্ঠুর বলপ্রয়োগ করে বাধ্য ও অনুগত করাটিই প্রধান প্রবণতা। আধুনিক নাটক কিংবা কবিতায় চাঁদ সওদাগরকে দৈববলের সামনে অনমনীয় একজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে হাজির করা হয় বটে, কিন্তু চাঁদের এই অনমনীয়তার মাঝে উচ্চকূলজাত ঔদ্ধত্যই প্রকট; চাঁদের আরাধ্য দেবতা ও দেবীগণ মনসার প্রতি যে অবিচার করেছেন, সেটি সেখানে উধাও হয়ে যায়। গবেষকরা দেখিয়েছেন বর্ণবিভাজন ও বৈদিক শাসন চাপিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে সংঘাতেরই একটি নিদর্শন মনসামঙ্গল কাব্য। বাংলা মঙ্গলকাব্যের জন্মের কালে মুসলিম শাসনের রাজনৈতিক উপস্থিতিও হয়তো ব্রাহ্মণ্য মতাদর্শিক বিস্তারের ক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করে দিয়েছিল, তাদের মন্দির আর পূজোতে রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতার অভাব লৌকিক দেবদেবীর পূজোকে হয়তো আরও শক্তি জুগিয়েছিল। কিন্তু এই সব কিছুর মধ্য দিয়ে কৃষিসভ্যতারই আরও বিস্তার ঘটছিল, তাতে সন্দেহ নেই।

কিন্তু মনসামঙ্গল আর একটি কারণে ব্যতিক্রমী। সেটি বেহুলা চরিত্রটি। এই নিষ্ঠুরতা, বলপ্রয়োগ আর হিংসার পর বেহুলা স্থিতির, হিংসাতীর্ণ নতুন পর্বে উত্তরণের প্রতীক। সঙ্গত উত্তরাধিকার বঞ্চিত পদ্মাবতীর যাবতীয় ক্রোধের মীমাংসা যখন ঘটলো, তখনই কেবল সম্ভব হলো শান্তির এই ধারণার। হিংসার অবসানের জন্য যেমন আগে চাই হিংসার কারণের অবশেষ।

sdfnhgdfg
ফিরোজ আহমেদ

প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক কর্মী

বিভাগ

কবিতা

error: Content is protected !!
We use cookies to personalise content and ads, to provide social media features and to analyse our traffic. We also share information about your use of our site with our social media, advertising and analytics partners. View more
Cookies settings
Accept
Privacy & Cookie policy
Privacy & Cookies policy
Cookie name Active

🍪 We Use Cookies

Our website uses cookies to improve your experience. They help us remember your preferences and analyze traffic. Some cookies are essential, while others help us optimize content. By continuing to browse, you agree to our use of cookies. You can manage cookie settings in your browser.

Save settings
Cookies settings
Scroll to Top